Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি শাসনের নৃশংসতা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক গভীর দাগ রেখে গেছে (Women in Germany)। কোটি কোটি নিরপরাধ ইহুদি, রোমা, প্রতিবন্ধী, এবং রাজনৈতিক বন্দিকে অকথ্য অত্যাচারের পর হত্যা করা হয়। ইতিহাস ও চলচ্চিত্রে আমরা সাধারণত এই সময়ের নারীচিত্র দেখি পরিবার হারানো, ধর্ষিত, নিপীড়িত, বা শরণার্থী। কিন্তু ইতিহাসবিদ ওয়েন্ডি লোয়ার তাঁর বই Hitler’s Furies: German Women in the Nazi Killing Fields এ দেখিয়েছেন, এই চিত্রটি একমাত্রিক নয়। নাৎসি রাষ্ট্রযন্ত্রের এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হল অসংখ্য জার্মান নারীও এই হত্যাযজ্ঞের সক্রিয় সহযোগী ছিল।

নারীর অজানা নৃশংসতা (Women in Germany)
ওয়েন্ডি লোয়ার, মার্কিন ইতিহাসবিদ ও ক্লেয়ারমন্ট ম্যাককেনা কলেজের অধ্যাপক, বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নাৎসি যুগের নথি, ডায়েরি, ব্যক্তিগত চিঠি, এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বিচারালয়ের দলিল পর্যালোচনা করে এই সত্য উদঘাটন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৩৯ সালে জার্মানির প্রায় ৪ কোটি নারীর মধ্যে অন্তত ১ কোটি ৩০ লক্ষ নারী কোনো না কোনোভাবে নাৎসি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ নারীকে পাঠানো হয়েছিল পূর্ব ইউরোপের দখলকৃত অঞ্চলগুলোয় যেমন পোল্যান্ড, ইউক্রেন, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া যেখানে ইহুদি গণহত্যা চলছিল দৈনন্দিন কাজের মতো স্বাভাবিকভাবে।
প্রশাসক থেকে হত্যাকারী (Women in Germany)
এই নারীরা কেবল টাইপিস্ট বা নার্স ছিল না। কেউ কেউ বন্দিশিবিরে প্রহরী, কেউ সমাজকর্মী, শিক্ষক, আবার কেউ সরাসরি হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণকারী। ইর্মা গ্রেসে, ইলসে কখ, মারিয়া ম্যান্ডেল, অ্যালিস অর্লভস্কি, দোরোথিয়া বিন্ৎস এই নামগুলো ইতিহাসে আজ ভয়ঙ্কর প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তারা বন্দিদের গ্যাসচেম্বারে ঠেলে দিত, কুকুর দিয়ে ছিঁড়তে দিত, শিশুদের হত্যা করত, এমনকি বন্দিদের দেহ দিয়ে “সাজসজ্জার সামগ্রী” বানানোর অভিযোগও রয়েছে। লোয়ারের গবেষণায় উঠে এসেছে, এই নারীদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসা যারা নাৎসি মতাদর্শে “বর্ণগত বিশুদ্ধতা” এবং “আর্য শ্রেষ্ঠত্ব”-এ বিশ্বাসী ছিল।

সহিংসতা ও স্বাধীনতার বিকৃত (Women in Germany)
যুদ্ধের সময় পুরুষেরা যখন সামরিক ফ্রন্টে যায়, তখন পূর্ব ইউরোপের দখলকৃত অঞ্চলে নারীদের হাতে আসে প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতা। এই নতুন “স্বাধীনতা” তাদের মধ্যে অনেকের মধ্যে জন্ম দেয় এক বিকৃত মানসিক উন্মাদনা যাকে জার্মান ভাষায় বলা হত Ostrausch বা “পূর্বের উন্মাদনা”। এই উন্মাদনা ছিল সহিংসতা, ভোগবিলাস ও আধিপত্যের এক মিশ্র রূপ। অনেক নারী বন্দিদের উপর গুলি চালিয়ে “বিনোদন” পেত, কেউ সৈন্যদের উৎসাহ দিত বন্দিদের হত্যা করতে, কেউ আবার বন্দিশিবিরের পাশেই “শিকার পার্টি”-তে অংশ নিত।
নার্স, শিক্ষিকা ও সমাজকর্মীদের ভয় (Women in Germany)
নাৎসি নার্সদের বড় একটি অংশ মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিল। তারা হাসপাতালে প্রতিবন্ধী, মানসিক রোগী ও শিশুদের গোপনে হত্যা করত যাকে বলা হত “Euthanasia Program”। স্কুলের শিক্ষিকারা শিশুদের শেখাত “জাতিগত বিশুদ্ধতা”-র পাঠ, এবং দুর্বল বা অসুস্থ ছাত্রদের “অযোগ্য” হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজচ্যুত করত। এইভাবে “মাতৃত্ব” ও “সেবা”র প্রতীক হিসেবে বিবেচিত নারী হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর মতাদর্শের বাহক।

অপরাধ ঢেকে ফেলার ইতিহাস
যুদ্ধশেষে নাৎসি পুরুষ অপরাধীদের অনেককে বিচারের মুখোমুখি করা হলেও, নারীদের অধিকাংশই অক্ষত থেকে যায়। অনেকেই নিজেদের “ভিকটিম” বলে দাবি করে, প্রমাণের অভাবে মুক্তি পায়। জোহান্না আল্টফাটার, যিনি শিশুদের মাথা দেয়ালে ঠুকে হত্যা করতেন, ১৯৭৯ সালে জার্মান আদালতে মুক্তি পান। অল্প কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, অধিকাংশ নারী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়, বিয়ে করে, সন্তান জন্ম দেয়, শিক্ষকতা বা নার্সিংয়ের কাজ চালিয়ে যায় যেন কিছুই ঘটেনি।

আরও পড়ুন: Andhra Pradesh: অন্ধ্রপ্রদেশে এনকাউন্টার, নিহত অন্তত ছয় মাওবাদী – শীর্ষ কমান্ডার হিদমা কি মৃত?
নারীর নিষ্ঠুরতার পুনর্মূল্যায়ন
লোয়ারের গবেষণা আমাদের শেখায়, নিষ্ঠুরতা বা সহানুভূতির ক্ষমতা লিঙ্গ দ্বারা নির্ধারিত নয়। নারীর মধ্যেও রয়েছে ক্ষমতার লালসা, ঘৃণা, ও হিংসার প্রবণতা যা সঠিক মতাদর্শের নামে বিকৃত হয়ে ওঠে ভয়াবহ রূপে। এই নারীরা শুধু “ফিউরারের দাসী” ছিল না তারা ছিল হিটলারের রক্তাক্ত সাম্রাজ্যের এক অপরিহার্য অংশ।



