Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ঢাকায় কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে মৌলবাদী (Kazi Nazrul Islam) ও ভারত-বিরোধী সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র ওসমান হাদিকে কবরস্থ করার সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক বা ধর্মীয় বিষয় নয় এটি সরাসরি কবি নজরুল ইসলামের আদর্শ, দর্শন ও উত্তরাধিকারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কবির পরিবার, ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বাংলার নজরুল গবেষক ও সাংস্কৃতিক মহল, প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আসানসোল-চুরুলিয়ার মানুষজনও।
নজরুলের সাম্যবাদী দর্শন (Kazi Nazrul Islam)
কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদের প্রবক্তা। ‘এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান’ এই পঙ্ক্তি কেবল কবিতা নয়, তাঁর জীবনদর্শনের সারাংশ। শ্যামাসংগীত যেমন গেয়েছেন, তেমনই লিখেছেন ইসলামী সংগীত। তাঁর লেখায় ছিল বিদ্রোহ, কিন্তু সেই বিদ্রোহ ছিল শোষণ, ধর্মীয় কট্টরতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। জীবদ্দশাতেই মৌলবাদীদের রোষানলে পড়েছিলেন নজরুল। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কলম ধরার অপরাধে তাঁকে কারাবরণ পর্যন্ত করতে হয়েছিল। সেই কবির সমাধির পাশে এক কট্টরপন্থী নেতাকে সমাধিস্থ করা অনেকের কাছেই তা এক ভয়াবহ বৈপরীত্য।
‘কবির সমাধি অক্ষত তো?’ (Kazi Nazrul Islam)
কাজী পরিবার এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চুরুলিয়ায় বসবাসকারী নজরুল পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁদের জানা মতে বাংলাদেশের জাতীয় কবির সমাধির পাশে কেবলমাত্র কয়েকজন বিশিষ্ট কবির কবর থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেই রীতিকে ভেঙে এক মৌলবাদী নেতাকে সেখানে সমাধিস্থ করা নজরুলের মর্যাদাকে খর্ব করছে। নজরুল ইসলামের ভাইপোর মেয়ে সোনালি কাজির বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর কথায়, নজরুল বিশ্বজুড়ে পরিচিত মানবতার কবি হিসেবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁকে সাধারণ মানুষের ভিড়ে এক করে দেওয়া হচ্ছে, তাঁর ঐতিহাসিক ও আদর্শগত গুরুত্বকে লঘু করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই পরিস্থিতিতে কবির সমাধির নিরাপত্তা আদৌ নিশ্চিত থাকবে তো?

নজরুল অকাদেমি ও চুরুলিয়ার প্রতিবাদ (Kazi Nazrul Islam)
শুধু পরিবার নয়, এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন নজরুল অকাদেমির সদস্যরাও। চুরুলিয়ার বাসিন্দা ও নজরুল গবেষক কাজী বাপ্পা স্পষ্ট ভাষায় এই সিদ্ধান্তকে ধিক্কার জানিয়েছেন। তাঁর মতে, হাদি ছিলেন কট্টরপন্থী নেতা, আর নজরুল ছিলেন আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামী কণ্ঠস্বর। এই দুই বিপরীত আদর্শকে পাশাপাশি বসানো নজরুলের প্রতি অবমাননার শামিল। চুরুলিয়ার সাধারণ মানুষও এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ। তাঁদের কাছে নজরুল শুধু ইতিহাসের কবি নন, আবেগ ও আত্মপরিচয়ের অংশ।
নজরুল বাঙালির সম্পদ! (Kazi Nazrul Islam)
এক স্থানীয় চিকিৎসকের মন্তব্য এই বিতর্কের আবেগী দিকটি তুলে ধরে। তাঁর কথায়, নজরুলের কবর বাংলাদেশে থাকলেও কবি বেঁচে আছেন ভারতের বাঙালির হৃদয়ে। নজরুল মানে সাম্য, বিদ্রোহ ও সম্প্রীতি। সেই কবির পাশে এক সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির কবর থাকা কোনোভাবেই শোভনীয় নয়। এখানে প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের নয়। নজরুল হলেন সমগ্র বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তাই তাঁর স্মৃতি ও সমাধি সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: Rajasthani Fair in Kolkata: কলকাতার বুকে এক টুকরো রাজস্থান ‘আপনো গাঁও’ মেলা
সিদ্ধান্তের নৈতিক প্রশ্ন
এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় জাতীয় কবির সমাধির পাশে কাদের স্থান দেওয়া হবে, তা কি কেবল ধর্মীয় বা প্রশাসনিক বিবেচনায় ঠিক হওয়া উচিত? নাকি কবির আদর্শ, দর্শন ও জীবনসংগ্রামকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন? যে কবি সারাজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সমাধির পাশে এক কট্টরপন্থী নেতার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গভীর নৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।



