Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত চাবাহার বন্দর বহু বছর ধরেই ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ (Chabahar Port)। পাকিস্তানের ভূখণ্ড এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপনের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ ছিল এই বন্দর। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আমেরিকা-ইরান সংঘাত এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা নীতির জেরে চাবাহার ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকার চাপে কি শেষ পর্যন্ত চাবাহার ছাড়তে বাধ্য হবে ভারত?

ট্রাম্পের ‘শুল্ক-হুঁশিয়ারি’ (Chabahar Port)
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। তেহরানের আকাশে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত, আর সেই আবহেই ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে কড়া বার্তা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপাবে আমেরিকা। এই হুঁশিয়ারির পরেই চাবাহার বন্দর নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে ওঠে। কারণ, ইরানের সঙ্গে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলমান প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম এই বন্দর। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ইরানের উপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি, গত বছর অক্টোবরেই তিনি প্রকাশ্যে চাবাহার নিয়ে ভারতের প্রতি ‘রক্তচক্ষু’ দেখান।
স্বস্তি না কি সময় কেনা? (Chabahar Port)
দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন প্রশাসন চাবাহারে ভারতীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য ৬ মাসের ছাড় দিয়েছিল। সেই মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৬ এপ্রিল। বিদেশমন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মেয়াদ বৃদ্ধি করার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে এখনও আলোচনা চলছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ৬ মাসের ছাড় আদতে ভারতের জন্য ‘সময় কেনা’র সুযোগ মাত্র। উদ্দেশ্য একটাই এই সময়ের মধ্যেই ভারত যেন ধীরে ধীরে চাবাহার থেকে নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এপ্রিলের পর আদৌ কোনও ছাড় মিলবে কি না।

ইঙ্গিতবাহী সিদ্ধান্ত? (Chabahar Port)
চাবাহার নিয়ে ভারতের অবস্থান বদলের সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত মিলেছে সদ্য পেশ করা কেন্দ্রীয় বাজেটে। এই প্রথমবার চাবাহার বন্দরের জন্য শূন্য বরাদ্দ রেখেছে মোদি সরকার। অতীতে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে চাবাহার প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রথমে ১০০ কোটি ধরা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৪০০ কোটি করা হয়। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে এসে এক পয়সাও বরাদ্দ না রাখার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন কূটনৈতিক চাপ এবং সম্ভাব্য শুল্ক-ঝুঁকি।
বিরোধীদের আক্রমণ (Chabahar Port)
চাবাহার ইস্যুতে বিরোধীরাও সরব হয়েছে। সংসদে কেন্দ্রের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং লিখিত জবাবে জানান, চাবাহার প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক নীতির প্রভাব মোকাবিলায় সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। এই বক্তব্যে স্পষ্ট আশ্বাসের অভাব থাকায় রাজনৈতিক মহলে সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব (Chabahar Port)
২০১৬ সালের মে মাসে ভারত, ইরান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশের মধ্যে চাবাহার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের খুব কাছেই অবস্থিত এই বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণে ভারত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিপুল বিনিয়োগের, প্রায় ৫০ কোটি ডলার। এই বন্দরের মাধ্যমে, পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার না করেই আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বাজারে পৌঁছনো সম্ভব, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ানো যায়, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের অবস্থান মজবুত হয়।

আরও পড়ুন: H5N1 Outbreak: শতাধিক কাকের মৃত্যু, পরীক্ষায় ধরা পড়ল H5N1 ভাইরাস
গুয়াদর বনাম চাবাহার
চাবাহার শুধু বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, এটি ছিল চিন-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে ভারতের কৌশলগত পালটা চাল। চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের গুয়াদরে চিন ইতিমধ্যেই একটি গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছে। গুয়াদর থেকে জলপথে ২০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে চাবাহার। ফলে এই বন্দরের মাধ্যমে ভারত সরাসরি চিনের প্রভাববলয়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই চাবাহার নিয়ে চিন ও পাকিস্তান দু’দেশেরই গভীর উদ্বেগ ছিল।



