Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ১৯৫২ সাল। জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ। শীতের রোদ ঝকঝক করছে। কলকাতা তখনও কনকনে ঠান্ডা (West Bengal Assembly Election)। এই শহর, এই রাজ্য, এই দেশ সবকিছুর মধ্যেই এক নতুন ইতিহাস রচিত হতে চলেছে। সদ্য-স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। গণতন্ত্র তার প্রথম পরীক্ষায় নামছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি বউবাজার কেন্দ্রের ওয়েলিংটন স্ট্রিটের কর্পোরেশন মডেল স্কুলের সামনে একটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র। হঠাৎ খবর এল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় এই মঙ্গলবার সকালে এখানেই এসে ভোট দিয়েছেন। কোনও হৈচৈ নেই। কোনও স্লোগান নেই। উত্তেজনা নেই। মানুষ আসছেন, ভোট দিচ্ছেন, শান্তভাবে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আজকের দিনের চোখে পড়া দৃশ্যের সঙ্গে এই ছবির কোনও মিল নেই।

মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী, তবু নীরব শহর (West Bengal Assembly Election)
বিধানচন্দ্র রায় শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি নিজেও বউবাজার কেন্দ্রের প্রার্থী। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কসবাদী ফরোয়ার্ড ব্লকের সত্যপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়। তবু আশ্চর্যভাবে, মুখ্যমন্ত্রীর চারপাশে কোনও ক্যাডার বাহিনী নেই। কিছু দলীয় কর্মী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বটে, কিন্তু ‘ডাক্তারবাবু’-র সঙ্গে কথা বলছেন এমন লোক খুব কম। ভোট দিয়ে বিধানবাবু গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। সাংবাদিকদের ভিড় নেই। টিভি ক্যামেরা নেই। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দাপট তখন কল্পনার বাইরেও নয়। ভোট শেষে জানা গেল, এই কেন্দ্রে ভোট পড়েছে আনুমানিক ৪৫–৫০ শতাংশ।
উত্তেজনা আছে, হিংসা নেই (West Bengal Assembly Election)
কল্পনার অ্যাম্বাসাডরে চেপে এবার যাত্রা টালিগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রে। এখানে প্রার্থী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। তাঁর বিরুদ্ধে দু’জন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী, সুভাষবাদী ফরোয়ার্ড ব্লকের লীলা রায়, কংগ্রেসের প্রিয়রঞ্জন সেন। কলকাতা তখন উৎসাহে টগবগ করছে। মানুষের কৌতূহল, আগ্রহ প্রবল। কিন্তু কোথাও কোনও বড় সংঘর্ষ নেই। কোনও বোমাবাজি নয়। মারামারি নয়। এক কথায়, আজকের মানদণ্ডে বিচার করলে “ম্যাড়মেড়ে ভোট”।
লোকসভা ও বিধানসভা একসঙ্গে (West Bengal Assembly Election)
এই নির্বাচনেই একসঙ্গে হচ্ছে লোকসভা ও বিধানসভা ভোট। দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতায় জনসংঘের সভাপতি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের মৃগাঙ্কমোহন সর। উত্তর-পশ্চিম কলকাতায় একেবারে অন্য ছবি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন অধ্যাপক মেঘনাথ সাহা। পরে তিনিই জয়ী হন। নির্বাচন দপ্তরের ঘোষণা স্পষ্ট
“কলকাতা মহানগরীর ভোটগ্রহণ পর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন।”
‘নিরামিষ পটকা’ আর নিরুপদ্রব ভোট (West Bengal Assembly Election)
ভোটের প্রথম দিনে বেলগাছিয়ায় একটি ছোটখাটো পটকা ফাটে। কেউ আহত হননি। সেটাও যেন কালীপুজোর আনন্দের পটকাবোমাবাজি নয়। আজকের চোখে এ ঘটনা প্রায় তুচ্ছ। পরদিন সংবাদপত্রে ছাপা হয়, “কলকাতা মহানগরীর ৪০০০ কেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোট সম্পন্ন হইল।” সেই সময় সাংবাদিকরা জানতেন না ‘বুথ ক্যাপচারিং’, ‘রিগিং’ এই শব্দগুলো।

ভোটের সময়সূচি (West Bengal Assembly Election)
ভোট হত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তারপর এক ঘণ্টার মধ্যাহ্নভোজন বিরতি, “আপনারা খেয়ে-দেয়ে আসুন, তারপর আবার ভোট দিন।” দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা ভোট শেষ। এই সৌজন্য, এই মানবিকতা আজ কল্পনাও করা যায় না।
প্রশাসনের ভিত্তি (West Bengal Assembly Election)
প্রথম সাধারণ নির্বাচনের জন্য জওহরলাল নেহরু নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বেছে নেন এক বঙ্গসন্তানকে সুকুমার সেন। তিনি ছিলেন দক্ষ আমলা ও গণিতজ্ঞ। নেহরুর ধারণা ছিল, এত বড় দেশের নির্বাচন মানেই পরিসংখ্যানের বিশাল ভূমিকা। ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে গণনা সবখানেই পরিসংখ্যানবিদ্যার প্রয়োজন ছিল। নির্বাচন তখন নিছক রাজনীতি নয়, ছিল প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ।
ভোটদানের বৈষম্য (West Bengal Assembly Election)
উত্তর ও মধ্য কলকাতায় সকাল থেকেই নারী-পুরুষ ভোট দিতে নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ কলকাতায় ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম, বিশেষত নারী ভোটাররা বিকেলের দিকে বেশি আসেন। গ্রামবাংলায় ছিল আরও বেশি স্তব্ধতা। সরকারি ছুটি থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষ ভোট দিতে আসেননি। ভোটার সচেতনতা তখনও গড়ে ওঠার পথে।
সময়ের স্রোতে বদলে যাওয়া নির্বাচন
১৯৫২-র শান্ত ভোট থেকে ১৯৯০-এর কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচন পার্থক্য আকাশ-পাতাল। মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতায় বোমাবাজি, পিস্তল হাতে দুষ্কৃতীদের দাপট। অথচ নেতাদের মুখে একটাই শব্দ, “পিসফুল।” এই অবক্ষয় শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: Mid Day Meal Bihar: মিড ডে মিল খেয়ে অসুস্থ ৭০ পড়ুয়া, বিহারের স্কুলে চাঞ্চল্য!
নির্বাচন সংস্কার
টি এন সেশন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পর নির্বাচন সংস্কারে ঝড় তোলেন। পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর সঙ্গে তাঁর তীব্র সংঘাত ইতিহাসের অংশ। বুথভিত্তিক ফলাফল লোপ করে ব্যালট মিশিয়ে গণনার নিয়ম সবই ছিল হিংসা ঠেকানোর চেষ্টা। তবু ক্ষমতার রাজনীতি নিজের গতিতেই চলেছে।



