Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ডুয়ার্সের চা-বলয়ের প্রত্যন্ত জনপদে যেখানে এখনও বহু ক্ষেত্রে আধুনিক স্বাস্থ্যচর্চার আলো পুরোপুরি পৌঁছয়নি, সেখানে এক তরুণী নিঃশব্দে গড়ে তুলেছেন এক সামাজিক আন্দোলন (North bengal)। কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও সামাজিক বাধাকে উপেক্ষা করে গত এক দশক ধরে ঋতুস্রাব সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন আদিবাসী কন্যা প্রীতি মিঞ্জ, যিনি আজ সবার কাছে ‘প্যাড ওম্যান’ নামেই পরিচিত। তাঁর এই অনন্য সামাজিক উদ্যোগ অবশেষে পেয়েছে রাজ্য সরকারের স্বীকৃতি।

লজ্জা নয়, স্বাস্থ্যের বিষয় (North bengal)
চা-বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ঋতুস্রাবকে ঘিরে নানা কুসংস্কার ও সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের আলাদা করে রাখা, রান্নাঘরে প্রবেশ নিষেধ, এমনকি স্কুলে না যাওয়া এসবই ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে বহু কিশোরী কাপড় ব্যবহার করত, যা সঠিকভাবে পরিষ্কার না হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াত। এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেই প্রীতি মিঞ্জ বুঝতে পারেন, সমস্যার মূল শিকড় রয়েছে সচেতনতার অভাবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, লজ্জা বা ভয় নয় জ্ঞান ও সচেতনতাই হবে পরিবর্তনের হাতিয়ার।
ঘরে ঘরে সচেতনতার বার্তা (North bengal)
নিজ উদ্যোগে প্রীতি চা-বাগানের ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। প্রথম দিকে তাঁকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে সমাজের বিরূপ মন্তব্য, আর্থিক সংকট, এমনকি পরিবারের সংশয়ও ছিল। কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি তিনি। তিনি মেয়েদের বোঝাতে থাকেন ঋতুস্রাব একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, অসুস্থতা নয়। স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা, নিয়মিত পরিবর্তন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এসব বিষয়ে সরল ভাষায় সচেতনতা গড়ে তুলতে থাকেন। তাঁর এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই আজ কয়েক হাজার কিশোরী ও তরুণী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানের উত্থান (North bengal)
প্রীতির কাজ শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নারীর আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আগে যেখানে ঋতুস্রাব নিয়ে কথা বলাই ছিল নিষিদ্ধ, সেখানে এখন মেয়েরা খোলামেলা আলোচনা করছে, নিজেদের শরীর সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। ফলস্বরূপ, অনেক কিশোরী আর ঋতুকালীন কারণে স্কুল ফাঁকি দিচ্ছে না। নিয়মিত পড়াশোনায় অংশগ্রহণ করছে, সামাজিক কার্যকলাপেও যুক্ত থাকছে। এক অর্থে প্রীতির উদ্যোগ চা-বলয়ের মেয়েদের জীবনে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।
এক সামাজিক আন্দোলনের সম্মান (North bengal)
প্রীতির এই অসাধারণ সামাজিক কর্মকাণ্ডের খবর পৌঁছে যায় প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা ও শংসাপত্র প্রদান করা হয়। রাজ্যের মন্ত্রী বুলুচিক বরাইক তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে এই সম্মান তুলে দেন। সম্মাননা প্রদানকালে মন্ত্রী বলেন, সমাজ গঠনের কাজে প্রীতির মতো তরুণীরাই প্রকৃত শক্তি। প্রত্যন্ত এলাকায় ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, তা আগামী দিনে অন্য অঞ্চলগুলির কাছেও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
দায়িত্ব আরও বাড়ল (North bengal)
এই বিশেষ স্বীকৃতি পেয়ে আবেগাপ্লুত প্রীতি মিঞ্জ মুখ্যমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তাঁর বক্তব্য, তিনি কখনও পুরস্কারের আশায় কাজ শুরু করেননি; তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল তাঁর ‘বোনেরা’ যেন সুস্থ থাকে এবং লজ্জা-ভয় কাটিয়ে নিজেদের শরীরের যত্ন নিতে পারে। রাজ্যের স্বীকৃতি তাঁর দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও বেশি এলাকায় সচেতনতার আলো পৌঁছে দিতে চান প্রীতি।
আরও পড়ুন: Bikash Bhawan Abhijan: টাকা বাড়লেই মিটবে পার্শ্বশিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ
অনুপ্রেরণার উৎস এক তরুণী
এর আগেও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও সামাজিক সংগঠন প্রীতিকে সম্মান জানিয়েছে। তবে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের স্বীকৃতি পাওয়ায় গোটা ওদলাবাড়ি আজ গর্বিত। এলাকাবাসীর মতে, প্রীতির এই সাফল্য চা-বলয়ের অন্যান্য মেয়েদের সমাজসেবামূলক কাজে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।



