Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সল্টলেকে ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় প্রতিদিন হাজার হাজার পাঠকের ভিড় (Kolkata Book Fair)। বইয়ের গন্ধ, লেখকের অটোগ্রাফ, আলোচনার উত্তাপ সব মিলিয়ে শহরের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র। কিন্তু এই উৎসবের ঠিক বাইরে, গেট নম্বর ৫-এর সামনে, আরেকটি মেলা চলছে যেখানে বই নেই, কিন্তু আছে হাতের কাজ, শিল্পের ঘাম আর প্রতিবাদের নীরব ভাষা।

ফুটপাথে বসা শিল্পীরা (Kolkata Book Fair)
‘আদরে আখরে’র শালিনী ঘোষের অভিজ্ঞতা (Kolkata Book Fair)
প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন শিল্পী ফুটপাথে ত্রিপল পেতে বসেছেন। হাতে বানানো নোটবুক, বুকমার্ক, গয়না, হোম ডেকর, পেইন্টিং, ইতার সবকিছুই সাজানো খোলা আকাশের নিচে। এঁদের অনেকেই সরকারি আর্ট কলেজ ও বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রী। কিন্তু এই জায়গা তাঁদের পছন্দ নয়, বরং বাধ্য হয়ে এখানে বসা। কারণ, এ বছর তাঁদের বইমেলার ভেতরে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এই শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম শালিনী ঘোষ, ‘আদরে আখরে’-এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রায় এক দশক ধরে তিনি বইমেলায় হাতে বানানো নোটবুক বিক্রি করছেন। তাঁর কাছে সরকারি কারিগর পরিচয়পত্রও রয়েছে। শালিনীর কথায়, “ন’ বছর ধরে পেশাদারভাবে কাজ করছি। আগে নিয়মিত ভেতরে বসার সুযোগ পেতাম। গত বছর থেকে হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল। কোনও কারণ জানানো হয়নি।” তবে সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে বহু পাঠক আবার ফিরে এসে তাঁকে খুঁজে পাচ্ছেন এইটুকুই এখন ভরসা।
ভাঙচুর ও সংহতির গল্প (Kolkata Book Fair)
২৭ জানুয়ারি রাতে আরও এক ধাক্কা আসে। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পর অজ্ঞাতপরিচয় লোকজন শিল্পীদের স্টল ভাঙচুর করে। পরদিন সকালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র দেখে ভেঙে পড়লেও, তাঁরা হাল ছাড়েননি। “আমরা সবাই মিলে আবার সব গুছিয়ে নিয়েছি। সাধারণ মানুষের সমর্থন আমাদের শক্তি দিয়েছে,” বললেন শালিনী।

সংস্কৃতির মালিক কে? (Kolkata Book Fair)
এই শিল্পীদের অনুপস্থিতি নজর এড়ায়নি পাঠক ও শিল্পীদের। সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। নিয়মিত বইমেলা-দর্শক অরিত্র বিশ্বাস লেখেন, “বইমেলা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ছোট বাংলা শিল্পীরা বরাবরই এই মেলার অঙ্গ। যদি বই ছাড়া কিছুই না থাকে, তাহলে খাবারের স্টলও থাকা উচিত নয়।” ত্রিনা সরকার প্রশ্ন তুলেছেন, “কেমন শিল্পপরিসর যেখানে শিল্পীদের ফুটপাথে বসতে হয়?”
পাঠকদের হতাশা ও অপরাধবোধ (Kolkata Book Fair)
অনেক পাঠক জানতেই পারেননি যে প্রিয় শিল্পীরা এবার মেলার বাইরে। এক পাঠকের কথায়, “ভেতরে খুঁজে পাইনি। পুলিশ বলল, ওঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আগে জানলে বাইরে এসে কিনতাম।”
নিরাপত্তা ও নিয়মের যুক্তি (Kolkata Book Fair)
সূত্রের খবর, এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণেই ফুটপাথে বসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও অগ্নি-ঝুঁকির অভিযোগও উঠেছে। তিনি আরও বলেন, “আগে কিছু স্টল বেআইনিভাবে শিল্পীদের দেওয়া হয়েছিল। তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে আর বরাদ্দ দেওয়া হবে না। তাছাড়া এ বছর কোনও আবেদনও জমা পড়েনি।”

সংস্কৃতির সংজ্ঞা কি বদলাচ্ছে? (Kolkata Book Fair)
এই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বইমেলা কি কেবল বই কেনাবেচার জায়গা, নাকি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসর যেখানে শিল্প, হস্তশিল্প ও সৃজনশীলতার সহাবস্থান থাকবে? ফুটপাথে বসা শিল্পীরা আজ সেই প্রশ্নটাই ছুঁড়ে দিচ্ছেন নীরবে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে।
আরও পড়ুন: Ajit Pawar: শোকস্তব্ধ বারামতি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষযাত্রা, চিরবিদায় অজিত পাওয়ারের…
আশার আলো ফুটপাথেই
সব প্রতিবন্ধকতার মাঝেও শিল্পীরা বসে আছেন গেটের বাইরে। ভরসা মানুষ, মুখে মুখে কথা ছড়ানো আর সহমর্মিতা।
এক শিল্পীর ফেসবুক পোস্টেই যেন সার কথা, “বইমেলার ভেতরে জায়গা না থাকলেও, আমাদের কাজ থামবে না। আমরা ঠিক বাইরে আছি।”



