Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল (Mani Sankar)। প্রবীণ সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় যিনি সাহিত্যজগতে ‘শংকর’ নামেই অধিক পরিচিত বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন। তাঁর প্রয়াণের খবর প্রকাশ্যে আসতেই সাহিত্যজগৎ থেকে বইপাড়া, পাঠকসমাজ থেকে রাজনৈতিক মহল সর্বত্র নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। শংকরের মৃত্যু কেবল একজন লেখকের বিদায় নয়; এটি এক যুগের অবসান। তাঁর কলমে ধরা পড়েছিল শহুরে জীবনের অন্তর্লীন সত্য, মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক সংকটের বহুমাত্রিক কাহিনি।

‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘জনঅরণ্য’ (Mani Sankar)
শংকরের সাহিত্যজীবনের উল্লেখযোগ্য মাইলফলকগুলির মধ্যে রয়েছে চৌরঙ্গী, কত অজানারে, সীমাবদ্ধ এবং জনঅরণ্য (Mani Sankar)। প্রতিটি গ্রন্থেই তিনি তুলে ধরেছেন নাগরিক জীবনের অনুচ্চারিত ব্যথা ও দ্বন্দ্ব। ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসে শাজাহান হোটেলকে কেন্দ্র করে যে বহুমাত্রিক মানবজীবনের কোলাজ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। হোটেলের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক টানাপড়েন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নিঃসঙ্গতার গল্প পাঠকদের গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। আজও বইটি বেস্টসেলার, যা প্রমাণ করে তার কালজয়িতা। অন্যদিকে ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জনঅরণ্য’-এ উঠে এসেছে কর্পোরেট দুনিয়ার নির্মম প্রতিযোগিতা, নৈতিক আপস এবং মধ্যবিত্ত মানসিকতার সংকট। এই উপন্যাসগুলি শুধু সাহিত্য নয়, সমাজ-মনস্তত্ত্বেরও দলিল।
জীবনসংগ্রাম থেকে সাহিত্যসৃষ্টি (Mani Sankar)
১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন শংকর। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় তাঁকে। কখনও কেরানির কাজ, কখনও হকারি জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে মাটি-ছোঁয়া সত্যতা। কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নায়েল ফ্রেডারিক বারওয়েল-এর অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় ‘কত অজানারে’। এই উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেন ঔপনিবেশিক আমলের অন্তিম অধ্যায় এবং এক তরুণ বাঙালির আত্মগঠনের কাহিনি।

সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর (Mani Sankar)
শংকরের লেখার প্রধান শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের না-বলা কথা তুলে ধরা। তাঁর চরিত্ররা ছিলেন আমাদের আশেপাশের মানুষ স্বপ্ন দেখা, ব্যর্থ হওয়া, আপস করা কিংবা সংগ্রামে অবিচল থাকা মানুষ। তিনি সমাজের প্রান্তিকতা বা মধ্যবিত্তের সংকটকে রোমান্টিক করেননি; বরং নির্মোহ ভঙ্গিতে বাস্তবতাকে ধরেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর স্বামী বিবেকানন্দ বিষয়ক গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ, যেখানে তিনি আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদের এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এতে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মননশীল গবেষকের পরিচয়ও।
আরও পড়ুন: Mani Shankar: জন অরণ্যে বিলীন স্যাটা বোস এর স্রষ্টা, প্রয়াত সাহিত্যিক শংকর
রাজনৈতিক মহলের শোকবার্তা
শংকরের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন, শংকরের কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে এবং তাঁর সাহিত্য আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার-ও শোকবার্তায় বলেছেন, শংকরের সাহিত্যকীর্তি বাংলার পাঠকসমাজকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতেও অনুপ্রেরণা জোগাবে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও সকলের শোকবার্তায় একটাই সুর বাংলা সাহিত্য হারাল এক মহীরুহকে।



