Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে সৌরজগতের গঠনপর্বে ধূলিকণা ও শিলাখণ্ডের সংঘর্ষ থেকে জন্ম নেয় আমাদের পৃথিবী (Cyanobacteria)। সেই প্রথম মুহূর্ত থেকেই গ্রহটি দ্রুতগতিতে নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে থাকে। কিন্তু কোটি কোটি বছরের সময়কালে এই ঘূর্ণনের গতি ক্রমশ ধীর হতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর এক দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মানুষের দৈনন্দিন সময়–গণনার নিরিখে এই পরিবর্তন অতি ক্ষুদ্র ও প্রায় অদৃশ্য, কিন্তু ভূতাত্ত্বিক পরিসরে এটি বিশাল প্রভাব ফেলেছে।
২০২১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির সঙ্গে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধির একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। মূলত এ পরিবর্তন জীবনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রূপান্তর ঘটিয়েছিল।
নীল–সবুজ শৈবাল ও প্রাথমিক অক্সিজেন (Cyanobacteria)
প্রায় ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর আদিম সমুদ্রে উদ্ভূত হয় এক অতি ক্ষুদ্র অথচ অসীম গুরুত্বপূর্ণ জীব—সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যা সাধারণভাবে নীল–সবুজ শৈবাল নামে পরিচিত। এরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে ফটোসিনথেসিস চালিয়ে অক্সিজেন উৎপাদন করতে সক্ষম। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, যখন দিনের দৈর্ঘ্য কিছুটা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখন এই সায়ানোব্যাকটেরিয়া তুলনামূলক বেশি সময় সূর্যালোক পায় এবং অধিক হারে ফটোসিনথেসিস করে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন নিঃসরণ করতে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজিস্ট গ্রেগরি ডিক ২০২১ সালে মন্তব্য করেছিলেন,
“পৃথিবীর বিজ্ঞানে একটি দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ছিল—পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন এল কীভাবে এবং কবে? আমাদের গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, দিনের দৈর্ঘ্য বা পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি এই অক্সিজেনেশনের ধরণ ও সময়কে প্রভাবিত করেছে।”
চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাব ও ধীরগতির ঘূর্ণন (Cyanobacteria)
পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। চাঁদ পৃথিবীর মহাসাগরে জোয়ার–ভাটা সৃষ্টি করে এবং জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণ শক্তি পৃথিবীর ঘূর্ণনশক্তি থেকে ধীরে ধীরে শক্তি কেড়ে নেয়। একই সঙ্গে চাঁদ প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর ফলেই পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ক্রমশ কমছে এবং দিন লম্বা হচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিক নথি বলছে, প্রায় ১.৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর এক দিনের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ১৮ ঘণ্টা। এমনকি ডাইনোসরের যুগ অর্থাৎ প্রায় ৭ কোটি বছর আগেও দিনের দৈর্ঘ্য ছিল আজকের তুলনায় প্রায় আধা ঘণ্টা কম। বর্তমানে আমরা প্রতি শতকে গড়ে প্রায় ১.৮ মিলিসেকেন্ড করে দিন বাড়াচ্ছি।
জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত! (Cyanobacteria)
প্রায় ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে সায়ানোব্যাকটেরিয়া ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ নাটকীয় হারে বেড়ে যায়। এই ঘটনাকেই বিজ্ঞানীরা গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট বা মহা অক্সিজেনায়ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেন। অক্সিজেনের এই বিপুল বৃদ্ধি না ঘটলে জটিল প্রাণের বিবর্তন সম্ভব হত না। তাই আজ সায়ানোব্যাকটেরিয়াকে অনেক সময় ‘বিরক্তিকর শৈবাল’ হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবে তাদের অবদান ছাড়া অস্তিত্বই থাকত না।
প্রাচীন জীবনের জানালা! (Cyanobacteria)
এই রহস্য উদঘাটনে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন এক অনন্য প্রাকৃতিক গবেষণাগার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেক হুরনের গভীরে অবস্থিত মিডল আইল্যান্ড সিংকহোল-এ পাওয়া গেছে বিশেষ ধরনের মাইক্রোবিয়াল ম্যাট। গবেষকদের মতে, এগুলি গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্টের জন্য দায়ী প্রাচীন সায়ানোব্যাকটেরিয়ার আধুনিক প্রতিরূপ।
এখানে দুই ধরনের ক্ষুদ্রজীব বাস করে! (Cyanobacteria)
- বেগুনি সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যারা সূর্যালোক পেলে অক্সিজেন উৎপাদন করে।
- সাদা সালফার–ভোজী মাইক্রোব, যারা আলোহীন অবস্থায় সালফার খেয়ে বাঁচে।
রাত হলে সালফার–ভোজী মাইক্রোবগুলো উপরের দিকে উঠে সালফার ভক্ষণ করে। সূর্যোদয়ের পর তারা নিচে নেমে যায় এবং তখন সায়ানোব্যাকটেরিয়া উপরের স্তরে উঠে এসে ফটোসিনথেসিস শুরু করে। অর্থাৎ অক্সিজেন উৎপাদনের জন্য দিনের সময়কালই মূল সুযোগের জানালা তৈরি করে।
দিনের দৈর্ঘ্য ও ফটোসিনথেসিসের সম্পর্ক (Cyanobacteria)
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাসাগরবিজ্ঞানী ব্রায়ান আরবিকে এই চক্র বিশেষভাবে ভাবায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন—
“দিনের দৈর্ঘ্য কি ফটোসিনথেসিসের সময়কে সরাসরি প্রভাবিত করেছে? যদি দিনের সময় দীর্ঘ হয়, তাহলে কি সায়ানোব্যাকটেরিয়া বেশি সময় ধরে অক্সিজেন তৈরি করতে পারত?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকরা প্রাকৃতিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ চালান, পাশাপাশি পরীক্ষাগারে সূর্যালোক, অন্ধকার ও অক্সিজেন উৎপাদনের মডেল তৈরি করে বিশ্লেষণ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, দিনের সময় যত বাড়ে, সায়ানোব্যাকটেরিয়ার ফটোসিনথেসিসও তত কার্যকর হয়, যা শেষ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়।
আরও পড়ুন: Hokkaido: প্রেম বয়েস মানে না, প্রতারণার খেলায় মাতে?
প্রকৃতিক ঘড়ি! (Cyanobacteria)
পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি, দিনের দৈর্ঘ্য এবং অক্সিজেনের আবির্ভাব—এই তিনটি আপাতভাবে আলাদা ঘটনা আসলে একই সূত্রে গাঁথা। চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাব পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর করেছে, দিনের সময় বাড়িয়েছে; আর সেই বাড়তি সূর্যালোকের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সায়ানোব্যাকটেরিয়া বিপুল অক্সিজেন উৎপাদন করেছে, যা জীবনের জন্য উপযোগী এক নতুন পরিবেশ তৈরি করেছে।



