Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইরান আবারও অস্থির। দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই–এর পদত্যাগ এবং মোল্লাতন্ত্রের অবসান দাবি করে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ (Iran)। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবাই এক কণ্ঠে শাসকবিরোধী স্লোগান তুলছেন। রাজধানী তেহরান-সহ একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের ঢেউ। এই অস্থিরতা কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক অসন্তোষ এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির অভিযোগ।

রাস্তায় জনতার স্রোত (Iran)
তেহরানের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানশরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি-এর ছাত্রছাত্রীরা সরাসরি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছেন। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীরা সরকারের পতন দাবি করছেন। ইরানে অতীতেও ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের বড় অনুঘটক হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ মনে করছে, বর্তমান শাসনব্যবস্থা তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত অধিকার এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সংকুচিত করছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে শহর ও প্রদেশে।
রেভল্যুশনারি গার্ডের ভূমিকা (Iran)
বিক্ষোভ দমাতে পথে নেমেছেইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এই বাহিনী ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নিরাপত্তাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে গ্রেপ্তার, বলপ্রয়োগ এবং ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা চলছে। এই চিত্র নতুন নয়। গত এক দশকে একাধিকবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় একই ধরনের কঠোরতার অভিযোগ উঠেছে।
শাহ থেকে মোল্লাতন্ত্র (Iran)
বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। ১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন খামেনেই। ধীরে ধীরে তিনি তৎকালীন ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা রুহোল্লাহ খোমেইনি-র ঘনিষ্ঠ সহচর হয়ে ওঠেন। সেই সময় ইরানে শাসন করছিলেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। পাহলভি আমলে পশ্চিমী সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পায়, নারীরা সামাজিক স্বাধীনতার স্বাদ পান, এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী হয়। কিন্তু একই সঙ্গে স্বজনপোষণ, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দমননীতির অভিযোগও বাড়তে থাকে। ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের মাধ্যমে পাহলভি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। খোমেইনির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং মোল্লাতন্ত্র। সেই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে খোমেইনির মৃত্যুর পর সুপ্রিম লিডার হন খামেনেই।
আঘাত, উত্থান ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ (Iran)
১৯৮১ সালে এক হামলায় গুরুতর আহত হন খামেনেই; তাঁর ডান হাতের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়। তবে রাজনৈতিক জীবনে তিনি আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সুপ্রিম লিডার হিসেবে সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর তাঁর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ গণতান্ত্রিক পরিসরকে সীমিত করেছে। সমর্থকদের মতে, এটি দেশকে স্থিতিশীল রেখেছে এবং বিদেশি প্রভাব থেকে রক্ষা করেছে। এই দ্বৈত বয়ানই আজকের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু।
কেন বারবার উত্তাল হচ্ছে ইরান? (Iran)
অর্থনৈতিক সংকট: আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সমস্যা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। সামাজিক বিধিনিষেধ: পোশাকবিধি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসন্তোষ। রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা: বিরোধী কণ্ঠের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা। এই তিনটি কারণ মিলেই ইরানে প্রতিবাদের আবহ তৈরি করছে।
আরও পড়ুন: Mani Shankar: জন অরণ্যে বিলীন স্যাটা বোস এর স্রষ্টা, প্রয়াত সাহিত্যিক শংকর
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বর্তমান বিক্ষোভ কতদূর গড়াবে, তা নির্ভর করছে সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং আন্দোলনের সংগঠিত শক্তির ওপর। ইতিহাস বলছে, ইরানে জনঅসন্তোষ কখনও হঠাৎ থেমে যায়নি বরং সময়ের সঙ্গে নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে সুপ্রিম লিডারের ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। তবে তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশের ভেতরে পরিবর্তনের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।



