Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: উত্তর কলকাতার প্রাচীন অলিগলির ভাঁজে লুকিয়ে আছে এমন এক মন্দির, যার নাম শুনলেই কৌতূহল জাগে দুর্গেশ্বর মোটা মহাদেব মন্দির (Mota Mahadev)। স্থানীয়দের দৃঢ় বিশ্বাস, গোটা কলকাতায় এত বড় শিবলিঙ্গ আর নেই। প্রায় ১০ ফুট উঁচু বিশালাকৃতি শিবলিঙ্গের জন্যই তিনি ‘মোটা মহাদেব’ নামে পরিচিত। এই দেবালয়কে ঘিরে রয়েছে আড়াই থেকে তিন শতাব্দীর ইতিহাস, জনশ্রুতি, বিশ্বাস ও রহস্যের মেলবন্ধন।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী (Mota Mahadev)
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, আঠারো শতকের শেষ দিকে, আনুমানিক ১৭৯৪ সালের কাছাকাছি সময়ে হাটখোলার দত্ত পরিবার এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় উত্তর কলকাতা ছিল জমিদার ও ব্যবসায়ী পরিবারগুলির সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল। সেই পরম্পরারই অংশ এই মন্দির। স্থাপত্যশৈলীতে এটি আটচালা ধাঁচের বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মন্দির নির্মাণশৈলীর এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বাইরে থেকে দেখলে আজ কিছুটা জরাজীর্ণ; দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, বটগাছের ঝুরি নেমে এসেছে প্রাচীর বেয়ে। তবু গর্ভগৃহে প্রবেশ করলেই এক গম্ভীর, আধ্যাত্মিক আবহ অনুভূত হয়, যেন সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
ভক্তির কেন্দ্রবিন্দু (Mota Mahadev)
মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ নিঃসন্দেহে বিশালাকৃতি শিবলিঙ্গ। এতটাই উঁচু যে, শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে ভক্তদের লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন প্রার্থনা জানাতে। বিশেষত শিবরাত্রির দিন ভক্তদের ঢল নামে। কারও হাতে দুধ, কারও হাতে গঙ্গাজল, কারও হাতে বেলপাতা। সারাদিন ধরে চলে মঙ্গলারতি, ভোগ আরতি, সন্ধ্যা আরতি শিবভক্তির এক অনন্য সমাবেশে পরিণত হয় মন্দির প্রাঙ্গণ।

শিকলে বাঁধা মহাদেব (Mota Mahadev)
এই মন্দিরকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো লোহার মোটা শিকল। জনশ্রুতি বলছে, বহু বছর আগে একদিন গর্ভগৃহের দরজা খুলে দেখা যায়, শিবলিঙ্গ নাকি স্থানচ্যুত। পরে গঙ্গা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই নাকি মহাদেবকে শিকল দিয়ে ‘বেঁধে’ রাখা হয়, যাতে তিনি আর গঙ্গায় ফিরে না যান। শিবকে আমরা চিনি ভোলানাথ, নির্লিপ্ত, মুক্তির দেবতা হিসেবে। সেই মহাদেবকে শিকলে বেঁধে রাখা ভাবলেই এক ধরনের শিহরণ জাগে। যদিও মন্দিরের পুরোহিতরা এই কাহিনিকে অলৌকিক বলে মানতে চান না; তাঁদের মতে, এটি লোকমুখে প্রচলিত গল্প মাত্র। তবুও মন্দির চত্বরে বহু পুরনো বিশাল লোহার শিকল আজও দেখা যায়, যা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে।
বিশাল বিগ্রহ ভেতরে এল কীভাবে? (Mota Mahadev)
আরও একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল জাগায় মন্দিরের দরজা তুলনামূলকভাবে ছোট, অথচ শিবলিঙ্গ বিশালাকার। এত বড় বিগ্রহ গর্ভগৃহে প্রবেশ করল কীভাবে? অনেকের ধারণা, শিবলিঙ্গটি আগে থেকেই সেখানে ছিল; পরে তাকে ঘিরেই মন্দির নির্মিত হয়। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট লিখিত প্রমাণ খুব সীমিত। ইতিহাস ও লোকবিশ্বাস এখানে যেন সমান্তরাল পথে চলেছে একটি যুক্তির, অন্যটি আস্থার।
আরও পড়ুন: Uttar Pradesh: চলন্ত গাড়ির উপর হাইমাস্ট পোল! প্রতাপগড়ে চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনা!
ধর্মীয় আচার
শিবরাত্রি ছাড়াও প্রতি সোমবার এবং বিশেষ তিথিতে এখানে পূজা দিতে ভক্তদের ভিড় লেগেই থাকে। স্থানীয়দের কাছে এই মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি প্রায় তিনশো বছরের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এই দেবালয় প্রমাণ করে, কলকাতার বুকে শুধু ঔপনিবেশিক স্থাপত্য বা আধুনিক নগরায়নই নয়, রয়েছে গভীরভাবে প্রোথিত লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। ‘মোটা মহাদেব’ তাই কেবল একটি বিশাল শিবলিঙ্গ নন তিনি উত্তর কলকাতার স্মৃতি, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক জীবন্ত প্রতীক।



