Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: পরমাণু শক্তি মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় আবিষ্কার হলেও এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য(Nuclear Bomb Test)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন দেশ সামরিক উদ্দেশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে, যার অনেকগুলোই কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রদর্শন নয়, বরং ভূরাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ারও ছিল। এসব পরীক্ষার প্রভাব শুধু পরীক্ষাস্থলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—বরং বিশ্ব রাজনীতি, পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। এখানে তুলে ধরা হলো বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ১০টি পরমাণু পরীক্ষা, যা মানবজাতিকে আজও শিহরিত করে।
১. নাগাসাকি – জাপান (১৯৪৫) (Nuclear Bomb Test)
৯ আগস্ট ১৯৪৫, যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান বকস্কার জাপানের নাগাসাকিতে ফ্যাট ম্যান নামে প্লুটোনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। কয়েক সেকেন্ডে পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
- বিস্ফোরণ শক্তি: ২১ কিলোটন
- তাৎক্ষণিক মৃত্যু: প্রায় ৭৪,০০০ মানুষ
- পরবর্তী প্রভাব: বিকিরণজনিত অসুস্থতায় কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু, বহু প্রজন্ম ধরে জন্মগত বিকলাঙ্গতা।
এই হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ত্বরান্বিত করলেও ইতিহাসে এটি এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত।
২. হিরোশিমা – জাপান (১৯৪৫) (Nuclear Bomb Test)
৬ আগস্ট ১৯৪৫, এনোলা গে নামের বোমারু বিমান হিরোশিমায় লিটল বয় নামের ইউরেনিয়াম-২৩৫ বোমা ফেলেছিল।
- বিস্ফোরণ শক্তি: ১৫ কিলোটন
- তাৎক্ষণিক মৃত্যু: প্রায় ৭০,০০০ মানুষ
- দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: তেজস্ক্রিয়তার কারণে ক্যানসার, জেনেটিক সমস্যা, শহরের ৭০% অবকাঠামো ধ্বংস।
এটি ছিল ইতিহাসের প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার।
৩. ত্সার বোমা – সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৬১) (Nuclear Bomb Test)
৩০ অক্টোবর ১৯৬১, আর্কটিক মহাসাগরের নভায়া জেমলিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়।
- বিস্ফোরণ শক্তি: ৫০ মেগাটন (হিরোশিমার চেয়ে প্রায় ৩,৩০০ গুণ বেশি)
- পরিধি: বিস্ফোরণের শকওয়েভ পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে।
- ক্ষতি: বিস্ফোরণস্থল থেকে ৫৫ কিমি দূরের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় দেখানোর জন্য শক্তি প্রদর্শনী ছিল।

৪. অপারেশন ক্রসরোডস – যুক্তরাষ্ট্র (১৯৪৬) (Nuclear Bomb Test)
মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের বিকিনি অ্যাটলে পরিচালিত এই পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নৌবাহিনীর উপর পারমাণবিক অস্ত্রের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়।
- পরীক্ষার সংখ্যা: ২ (এবল ও বেকার)
- বিস্ফোরণ শক্তি: প্রত্যেকটি প্রায় ২৩ কিলোটন
- পরিণতি: স্থানীয় জনপদকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়, বিকিরণ দূষণে বহু নাবিক ও দ্বীপবাসীর মৃত্যু।
৫. অপারেশন কাসল ব্রাভো – যুক্তরাষ্ট্র (১৯৫৪) (Nuclear Bomb Test)
১ মার্চ ১৯৫৪, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের বিকিনি অ্যাটলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম থার্মোনিউক্লিয়ার (হাইড্রোজেন) বোমার পরীক্ষা হয়।
- বিস্ফোরণ শক্তি: ১৫ মেগাটন (প্রত্যাশার চেয়ে দ্বিগুণ)
- প্রভাব: তেজস্ক্রিয় ধুলো বাতাসে ছড়িয়ে পাশের দ্বীপ ও জেলেদের উপর পড়ে, বহু মানুষ বিকিরণজনিত রোগে আক্রান্ত হয়।
এটি ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
৬. চাগান টেস্ট – সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৬৫) (Nuclear Bomb Test)
পূর্ব কাজাখস্তানে এই পরীক্ষায় একটি ভূগর্ভস্থ বিস্ফোরণের মাধ্যমে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল।
- বিস্ফোরণ শক্তি: ১৪০ কিলোটন
- প্রভাব: বিকিরণমাত্রা এত বেশি ছিল যে হ্রদটি আজও বিপজ্জনক।
এটি “পিসফুল নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোশন্স” প্রোগ্রামের অংশ হলেও ফলাফল ভয়াবহ ছিল।

৭. স্মাইলিং বুদ্ধ – ভারত (১৯৭৪) (Nuclear Bomb Test)
১৮ মে ১৯৭৪, রাজস্থানের পোখরানে ভারতের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়।
- বিস্ফোরণ শক্তি: ৮ কিলোটন
- রাজনৈতিক প্রভাব: দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা হয়, পাকিস্তানও গোপনে পারমাণবিক কর্মসূচি ত্বরান্বিত করে।
৮. অপারেশন শক্তি – ভারত (১৯৯৮) (Nuclear Bomb Test)
১১ ও ১৩ মে ১৯৯৮, পোখরানে পাঁচটি পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়।
- বিস্ফোরণ শক্তি: ৪৫ কিলোটন (সবচেয়ে বড় পরীক্ষা)
- পরিণতি: পাকিস্তান একই বছরের মে মাসে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা চরমে তোলে।
৯. চাগাই-I – পাকিস্তান (১৯৯৮) (Nuclear Bomb Test)
২৮ মে ১৯৯৮, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের চাগাই পাহাড়ে পাঁচটি ভূগর্ভস্থ পরীক্ষা চালানো হয়।
- বিস্ফোরণ শক্তি: প্রায় ৪০ কিলোটন (সমষ্টি)
- রাজনৈতিক বার্তা: ভারতের অপারেশন শক্তির জবাব, ইসলামাবাদের পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ।

১০. উত্তর কোরিয়ার প্রথম পরীক্ষা (২০০৬) (Nuclear Bomb Test)
৯ অক্টোবর ২০০৬, উত্তর কোরিয়া প্রথমবার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়।
- বিস্ফোরণ শক্তি: আনুমানিক ১ কিলোটন
- আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: জাতিসংঘ কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা সংকট তীব্র হয়।
আরও পড়ুন : US President Salary : কত বেতন পান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ? একই বেতন পেতেন বুশ-ওবামা
পরমাণু পরীক্ষার বৈশ্বিক প্রভাব (Nuclear Bomb Test)
এই পরীক্ষাগুলো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন হলেও মানবসভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি ডেকে এনেছে(Nuclear Bomb Test)। বিকিরণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবেশ ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—সবকিছু মিলিয়ে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ২,০০০ এরও বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, চীন, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াও বিভিন্ন সময় এসব পরীক্ষায় যুক্ত হয়েছে।
আজকের বাস্তবতা (Nuclear Bomb Test)
বর্তমানে বেশিরভাগ দেশ কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার-টেস্ট-ব্যান ট্রিটি (CTBT) স্বাক্ষর করেছে, যা পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করে(Nuclear Bomb Test)। তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া এই চুক্তি অনুমোদন করেনি। এর ফলে বিশ্ব এখনো আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে যে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সংঘর্ষের সময় আবারও ধ্বংসাত্মক পরীক্ষা বা ব্যবহার হতে পারে।
পরমাণু পরীক্ষার ইতিহাস আমাদের শেখায়—এই অস্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে(Nuclear Bomb Test)। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ১০টি পরীক্ষার প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে, প্রযুক্তি যত উন্নত হোক না কেন, তার ব্যবহার যদি মানবিক বিবেচনা ছাড়া হয়, তবে ফলাফল হতে পারে অপূরণীয়।


