Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ডিজিটাল স্ক্রিন, ট্যাব আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপটের মাঝেও মুছে যায়নি এক প্রাচীন ঐতিহ্য। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনায় আজও অপরিহার্য খাগের কলম। আধুনিক লেখনী প্রযুক্তির যুগেও বাংলার এক প্রান্তে সেই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে পুরুলিয়া (Purulia)। সূত্রের খবর, চলতি বছরে সরস্বতী পুজোকে (Saraswati Puja 2026) কেন্দ্র করে এই জেলায় এসেছে প্রায় ১০ লক্ষ খাগের কলম যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
খাগের কলমের দীর্ঘ যাত্রাপথ (Saraswati Puja 2026)
সূত্রের খবর অনুযায়ী, কলকাতার বড়বাজার থেকেই মূলত এই বিপুল সংখ্যক খাগের কলম সংগ্রহ করা হয় (Saraswati Puja 2026)। সেখান থেকে ঝাড়খণ্ড সীমান্ত ছুঁয়ে পুরুলিয়ায় ঢোকে এই ঐতিহ্যবাহী লেখনী। জেলার প্রায় এক ডজন দশকর্মা সামগ্রীর পাইকারি বিক্রেতার হাত ধরে খুচরো দোকান হয়ে সেই কলম পৌঁছে যাচ্ছে প্রতিটি ঘরে ঘরে। পুরুলিয়ার দশকর্মা বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে বান্ডিল করে সাজানো খাগের কলম। এক একটি বান্ডিলে থাকে ১০০টি করে কলম। সোমবার থেকেই এই কলম, সঙ্গে লাল কালি বড়ি ও মাটির দোয়াত বিক্রি শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
লিখবেন স্বয়ং সরস্বতী’ (Saraswati Puja 2026)
এই খাগের কলম শুধুমাত্র লেখার উপকরণ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বাস ও আচার। দোয়াতে লাল রঙের একটি কালি বড়ি ফেলে তার সঙ্গে দুধ এবং সামান্য মধু মেশানো হয়। সেই মিশ্রণেই খাগের কলম ডুবিয়ে লেখা হয় প্রথম মন্ত্র। বিশ্বাস অনুযায়ী, ওই লেখনীতে হাত রাখেন স্বয়ং বাগদেবী। সূত্রের খবর বলছে, বসন্ত পঞ্চমীর পর তিথি শেষ হলে স্নান সেরে একটি কলাপাতায় লিখতে হয়, “ওঁ নমঃ সরস্বতী মাতা নমঃ” এই লেখার পরেই ছাত্রছাত্রীদের কুল খাওয়ার অনুমতি মেলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আচার আজও পুরুলিয়ায় সমানভাবে পালিত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের কথায় উৎসাহের ছবি (Saraswati Puja 2026)
পুরুলিয়া শহরের দশকর্মা ভাণ্ডারের পাইকারি বিক্রেতা নিখিলেশ দাস সূত্রের খবর অনুযায়ী জানান, “একটি বাড়িতে যতজন ছাত্র-ছাত্রী থাকে, সেই সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই খাগের কলম কেনা হয়। গত বছর একটু কম এনেছিলাম। এবার প্রায় এক লক্ষ কলম মজুত করেছি।” অন্য পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, গত বছরে যেখানে প্রায় পাঁচ লক্ষ খাগের কলম এসেছিল, সেখানে এ বছর সংখ্যাটা ছুঁয়েছে ১০ লক্ষ।

দাম কম, চাহিদা বেশি (Saraswati Puja 2026)
সূত্রের খবর অনুযায়ী, একটি খাগের কলমের দাম মাত্র এক টাকা। তবে কলম, লাল কালি বড়ি এবং মাটির দোয়াত মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ সেটের দাম পড়ে প্রায় ১০ টাকা। স্বল্পমূল্যের এই সামগ্রীই সরস্বতী পুজোর সময়ে হয়ে ওঠে অপরিহার্য। দশকর্মা ভাণ্ডারের আর এক পাইকারি বিক্রেতা ফাল্গুনী সেন জানান, “এই খাগের কলমের ঐতিহ্য এখনও মানুষের মনে গভীরভাবে রয়েছে। তাই সরস্বতী পুজোর সময় এই কলমের বাণিজ্য খুব জমজমাট হয়।”
মাটির দোয়াতেও গ্রামবাংলার ছোঁয়া (Saraswati Puja 2026)
এই খাগের কলমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে মাটির দোয়াত। সূত্রের খবর অনুযায়ী, পুরুলিয়া শহরের উপকণ্ঠে প্রদীপ গ্রাম কোটলয়ের কারিগররা হাতে তৈরি করেন এই ছোট্ট মাটির দোয়াত। প্রতিটির দাম মাত্র ২ টাকা। পুজোর প্রায় এক মাস আগেই পাইকারি দোকানগুলি এই দোয়াত সংগ্রহ করে রাখে।
ছাত্রছাত্রীদের আলাদা উন্মাদনা (Saraswati Puja 2026)
পুরুলিয়া শহরের আর এক পাইকারি বিক্রেতা অশোক নন্দীর কথায়, “এই খাগের কলমে লিখতে স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে আলাদা একটা আগ্রহ কাজ করে। সেই কারণেই প্রতি বছর বিক্রি এত বেশি হয়।” ডিজিটাল পেন বা কিবোর্ডের যুগেও এই কলমে প্রথম লেখার আনন্দ আজও ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিশেষ হয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন:Kolkata Book Fair: টাকা দেননি ট্রাম্প, তাই কলকাতা বইমেলা থেকে সরে দাঁড়াল আমেরিকা?
ইতিহাসের পাতায় কলমের যাত্রা
ইতিহাস বলছে, প্রায় ৫ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরীয়রাই প্রথম কলমের ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তখন কাগজের অস্তিত্ব ছিল না। গাছের পাতা, বাকল কিংবা প্যাপিরাসে লেখা হতো। রাজহাঁসের পালক ছিল লেখার প্রধান উপকরণ। সেই প্রাচীন ধারার উত্তরাধিকার বহন করেই আজও সরস্বতী পুজোয় ব্যবহৃত হচ্ছে খাগের কলম।



