Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতা শহরের বুকে যত প্রাচীন কালীমন্দির ছড়িয়ে রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হল ঠনঠনিয়া কালীমন্দির (Thanthania Kalibari)। আজও এই মন্দিরে প্রতিদিন অসংখ্য ভক্তের সমাগম হয়। শক্তির আরাধনা ও তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র হিসেবে এই স্থানটি বহু প্রাচীনকাল থেকেই পূজিত হয়ে আসছে।
ব্রহ্মচারীর হাত ধরে সূচনা (Thanthania Kalibari)
জনশ্রুতি অনুযায়ী, খ্রিষ্টাব্দ ১৭০৩ সালে সাধক উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরের মাতৃমূর্তি। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ তান্ত্রিক সাধক, যিনি শক্তি সাধনায় সিদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যে কলকাতার উত্তরাংশের এক নির্জন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই সময় কলকাতা শহরও গড়ে ওঠেনি। অঞ্চলটি ছিল জলাশয় ও ঘন বনে ভরা। এমন নির্জন অরণ্যের মাঝেই উদয়নারায়ণ মাটির মূর্তি গড়ে প্রতিষ্ঠা করেন মা সিদ্ধেশ্বরী কালী-র। দেবী এখানে পূজিত হন চতুর্ভুজা রূপে দুটি হাতে খড়্গ ও নরকপাল, আর বাকি দুটি হাতে অভয় ও বরদা মুদ্রা।
ঘণ্টাধ্বনির কিংবদন্তি (Thanthania Kalibari)
ঠনঠনিয়া নামটির উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে এক মনোমুগ্ধকর জনশ্রুতি। কথিত, সেই সময় মন্দিরের আশেপাশে লোকবসতি ছিল না। তবুও মাঝে মাঝে নির্জন বনের মধ্যে ভেসে আসত ঘণ্টাধ্বনি “ঠনঠন… ঠনঠন…”। ভক্তেরা বিশ্বাস করেন, সেটি ছিল দেবী কালী নিজে তাঁর উপস্থিতির জানান দিচ্ছিলেন। সেই থেকেই এলাকার নাম হয় ‘ঠনঠনিয়া’।
১৮০৬ সালের পুনর্গঠন (Thanthania Kalibari)
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটির দেওয়াল ও তালপাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি সেই প্রথম মন্দিরটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পরে ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে, ধনাঢ্য ব্যক্তিত্ব শঙ্কর ঘোষ আধুনিক রূপে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি গড়ে তোলেন আটচালা শিবমন্দির ‘পুষ্পেশ্বর শিব’-এরও। শঙ্কর ঘোষ নিজেই নিত্যসেবার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, এবং আজও তাঁর বংশধরেরাই মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মাতৃমূর্তি ও পূজা-পদ্ধতি (Thanthania Kalibari)
ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরে দেবীমূর্তি ধাতব বা পাথরের নয়, বরং মাটির তৈরি। প্রতি বছর দেবীমূর্তির নতুন করে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। দেবী ঘোর কৃষ্ণবর্ণা; পূজিত হন পূর্ণ তান্ত্রিক মতে। পূজার দিনে দেবীকে রূপো ও সোনার গয়নায় সজ্জিত করা হয়।
সারা বছর আমিষ ভোগের প্রথা চালু থাকলেও, ফলহারিণী কালীপুজো ও দীপান্বিতা অমাবস্যায় নিবেদন করা হয় নিরামিষ ভোগ।

রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সঙ্গে যোগসূত্র (Thanthania Kalibari)
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব-এর স্মৃতিও অমলিন এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শৈশবে যখন তিনি কলকাতায় ঝামাপুকুর অঞ্চলে বাস করতেন, তখন প্রায়ই এই মন্দিরে এসে মা সিদ্ধেশ্বরীকে গান শোনাতেন। একবার শিষ্য কেশবচন্দ্র সেন-এর গুরুতর অসুস্থতার সময়, রামকৃষ্ণদেব ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরে এসে ডাব ও চিনি দিয়ে দেবীর কাছে তাঁর আরোগ্য কামনা করেন। কেশবচন্দ্র সুস্থ হয়ে ওঠেন, এবং সেই থেকে এই মন্দিরে ডাব-চিনির নৈবেদ্য একটি স্থায়ী রীতি হয়ে যায়।
আজও সেই স্মৃতিবাহী বাণী মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা আছে—
“শঙ্করের হৃদয় মাঝে, কালী বিরাজে।”
পূজার সময়সূচি ও দর্শনব্যবস্থা (Thanthania Kalibari)
ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভক্তদের ভিড় লেগেই থাকে।
- মন্দির খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে রাত ৮:৩০ পর্যন্ত।
- দর্শনের সর্বোত্তম সময়: সকাল ৯টা–১২টা এবং বিকেল ৫টা–৮:৩০।
- ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
নিকটতম বিমানবন্দর হল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

কালীপুজো ও উৎসবের আভা (Thanthania Kalibari)
দীপান্বিতা অমাবস্যা বা কালীপুজোর সময় ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরের আকাশ আলোয় ভরে ওঠে। সেদিন হাজার হাজার মানুষ মায়ের দর্শনে আসেন, ভোগ নিবেদন করেন, সারা রাত জেগে শক্তির আরাধনা করেন। এই মন্দিরের পরিবেশে এক অনন্য প্রশান্তি, এক অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি অনুভূত হয়, যা ভক্তদের মনকে পরিশুদ্ধ করে তোলে।
আরও পড়ুন: Kali Puja in Fatakeshto: কে ছিলেন সেই ফাটাকেষ্ট, যার পুজো ছাড়া অসম্পূর্ণ কলকাতার কালীপুজো?
ঠনঠনিয়া কালীমন্দির আজও জাগ্রত
আজকের আধুনিক কলকাতার বুকেও ঠনঠনিয়া কালীমন্দির সেই প্রাচীন আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিকতা ধরে রেখেছে।
প্রতি শনি ও মঙ্গলবার, বিশেষত অমাবস্যার রাতে, এই মন্দিরে ভক্তের ঢল নামে। কেউ মনস্কামনা পূরণের আশায়, কেউ শক্তিসাধনার উদ্দেশ্যে, কেউ বা নিছক ভক্তির টানে মায়ের দর্শনে আসে।



