Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতের জাতীয় চেতনার অন্যতম আবেগঘন প্রতীক ‘বন্দে মাতরম’ (Vande Mataram)। স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল দিন থেকে শুরু করে আজকের প্রশাসনিক প্রোটোকল এই গানকে ঘিরে আবেগ, ইতিহাস ও বিতর্ক সমান্তরালভাবে চলেছে। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা নতুন নির্দেশিকা আবারও এই জাতীয় স্তোত্রকে জনআলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। সরকারি অনুষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

নতুন নির্দেশিকার মূল বক্তব্য (Vande Mataram)
নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, দেশের সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বা বাজানো বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, এবার ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের পূর্ণ ৬ স্তবকের সংস্করণ পরিবেশন করতে হবে। গান চলাকালীন সকলকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষত যেসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি উপস্থিত থাকেন, সেখানে তাঁর আগমন ও প্রস্থানকালে ‘বন্দে মাতরম’ বাজাতে হবে। পদ্ম পুরস্কারের মতো অসামরিক সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানেও এই গান পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে সিনেমা হলে গানটি বাজানো বাধ্যতামূলক নয় এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
‘জন গণ মন’ ও ‘বন্দে মাতরম’ (Vande Mataram)
জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’ এবং জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’ এই দুইয়ের মর্যাদা ও প্রোটোকল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার অবকাশ রয়েছে। নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংগীতের নির্দিষ্ট প্রোটোকল বজায় রেখেই ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় সংগীতের আগে, আবার কিছু ক্ষেত্রে পরে গানটি গাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা বাস্তব প্রয়োগে প্রশাসনিক ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করছে। এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় স্তোত্রের সাংবিধানিক মর্যাদার পার্থক্য কীভাবে বজায় রাখা হবে? যদিও সংবিধানে ‘জন গণ মন’ জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত, ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় স্তোত্র হিসেবে ঐতিহাসিক মর্যাদা বহন করে।
বঙ্কিমচন্দ্র থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন (Vande Mataram)
‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮২ সালে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ। গানটি মূলত সংস্কৃত ও বাংলার মিশ্র ভাষায় রচিত। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম গানটি সুর দিয়ে পরিবেশন করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ‘বন্দে মাতরম’ ছিল এক শক্তিশালী স্লোগান। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা এই গান উচ্চারণ করে আন্দোলনে অংশ নিতেন। ফলে গানটি শুধু সাহিত্যিক সৃষ্টি নয়, বরং রাজনৈতিক সংগ্রামেরও প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস সরকার গানটির চারটি স্তবক বাদ দিয়ে প্রথম দুটি স্তবককে সরকারি স্বীকৃতি দেয়। ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রশ্নে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। নতুন নির্দেশিকায় সেই পূর্ণ ৬ স্তবকই পরিবেশনের কথা বলা হয়েছে।
দেশপ্রেম ও শৃঙ্খলার বার্তা (Vande Mataram)
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতে, নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা এবং মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছোটবেলা থেকে জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার প্রয়াস হিসেবে এই পদক্ষেপকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রসহ কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যেই স্কুল-কলেজে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নির্দেশিকা কার্যকর হয়েছে। কেন্দ্রীয় উদ্যোগ সেই প্রক্রিয়াকে আরও সর্বভারতীয় রূপ দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা (Vande Mataram)
‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গানটির সম্পূর্ণ সংস্করণ পরিবেশন, ধর্মীয় অনুভূতি এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি মন্তব্য যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে জওহরলাল নেহেরু মুসলিম সম্প্রদায়ের চাপে গানটির চারটি স্তবক বাদ দিতে সমর্থন করেছিলেন তা নিয়ে কংগ্রেসের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। নতুন নির্দেশিকা সেই বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। একাংশ মনে করেন, এটি জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক গৌরবের প্রতীকী পুনরুজ্জীবন; অন্য অংশের মতে, এটি রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী পদক্ষেপ।
আরও পড়ুন: Bikash Bhawan Abhijan: টাকা বাড়লেই মিটবে পার্শ্বশিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ
ভারত একটি বহুত্ববাদী সমাজ, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি সহাবস্থান করে। জাতীয় প্রতীকগুলির ব্যবহার ও প্রয়োগ তাই সংবেদনশীল বিষয়। ‘বন্দে মাতরম’ স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক আবেগ বহন করলেও, তার পূর্ণ সংস্করণের কিছু অংশ নিয়ে অতীতে বিতর্ক হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক নির্দেশ বাস্তবায়নের সময় সামাজিক সম্প্রীতি ও সংবেদনশীলতার ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। জাতীয় ঐক্যের বার্তা তখনই কার্যকর হবে, যখন তা সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হবে।



