Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: জেনারেল বডি মিটিং বা জিবিকে কেন্দ্র করে বুধবার দিনভর উত্তপ্ত হয়ে উঠল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর (Jadavpur University)। SFI-সহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির উদ্যোগে আয়োজিত জিবি মিটিংয়ের বিরোধিতা করে ABVP। এরপর দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে বচসা থেকে হাতাহাতি এবং সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগ। ঘটনায় উভয় পক্ষেরই বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

বানচাল করার উদ্দেশ্যে উত্তেজনা (Jadavpur University)
ABVP র দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনও নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই। ছাত্র সংসদ সংক্রান্ত নতুন কোনও নির্দেশিকাও জারি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে জেনারেল বডি মিটিং ডাকা হল তা নিয়েই তারা প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, ABVP সমর্থকরাই মিটিং বানচাল করার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে! (Jadavpur University)
ঘটনার পর রাতে আরও উত্তেজনা ছড়ায় অরবিন্দ ভবনের সামনে। অভিযোগ SFI-সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ফেস্টুন ও পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে অরবিন্দ ভবনের ভিতরে থাকা পড়ুয়াদের একাংশ বন্ধ গেট ধরে ঝাঁকাতে থাকেন বলে অভিযোগ। ABVP-র অভিযোগ ভিতর থেকে তাঁদের লক্ষ্য করে ইট ছোড়া হয়েছে। যদিও অরবিন্দ ভবনে আশ্রয় নেওয়া পড়ুয়াদের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

বাসস্ট্যান্ডে জমায়েতের ডাক
এদিকে যাদবপুরকাণ্ডের প্রতিবাদে ৮বি বাসস্ট্যান্ডে জমায়েতের ডাক দিয়েছে SFI-সহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলি। পাল্টা যাদবপুর থানার সামনে থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অভিযানের ডাক দিয়েছে ABVP। ফলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন এলাকায়।
শিয়ারি দেন বিধায়িকা (Jadavpur University)
ঘটনার খবর পেয়ে এলাকায় পৌঁছন যাদবপুর বিধানসভার বিধায়িকা শর্বরী মুখোপাধ্যায়। আহত পড়ুয়াদের নিয়ে তিনি যাদবপুর থানায় যান। সেখানে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগ তোলেন তিনি। SFI এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের নাম উল্লেখ করেও হুঁশিয়ারি দেন বিধায়িকা বলে দাবি।
ABVP-র বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ
এরপর যাদবপুর থানার সামনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ দেখান ABVP সমর্থকরা। অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলিও পাল্টা ABVP-র বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে। সব মিলিয়ে জিবি মিটিং ঘিরে সংঘর্ষের পরও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনা অব্যাহত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ কী পদক্ষেপ করে এবং নতুন করে কোনও অশান্তি হয় কি না এখন সেদিকেই নজর। তবে সেগুলিকে বক্তার বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: KMC Ward: ১৪৪ থেকে ২০৯! বদলাচ্ছে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডের মানচিত্র, শীঘ্রই প্রকাশিত হবে নয়া খসড়া
তিন পক্ষের বক্তব্যে উঠে এল পরস্পরবিরোধী অভিযোগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে উত্তেজনা ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হয়েছে। একদিকে ABVP-র আক্রান্ত ছাত্রের অভিযোগ, অন্যদিকে SFI-এর পাল্টা দাবি— ঘটনাকে ঘিরে দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা, অশান্তি ও ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে যাদবপুরের বিধায়কের বক্তব্যেও উঠে এসেছে তীব্র আক্রমণাত্মক অভিযোগ।
যাদবপুরের বিধায়কের বক্তব্য (Jadavpur University)
যাদবপুরের বিধায়ক অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত কোনও ইউনিয়ন থাকার কথা নয়। তাঁর প্রশ্ন, সেই পরিস্থিতিতে কীভাবে General Body বা GB ডাকা হল এবং কে এই GB ডাকার অনুমতি দিয়েছে। তিনি SFI নেতা সৃজন ভট্টাচার্য ও সুজন চক্রবর্তীর উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁরা অবগত কি না এবং GB ডাকার পিছনে কারা রয়েছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

বিধায়কের আরও অভিযোগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশবিরোধী স্লোগান দেওয়া হয়েছে। তিনি ক্যাম্পাসে এ ধরনের স্লোগান ও রাজনৈতিক কার্যকলাপের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনওভাবেই নকশাল, মাওবাদী বা দেশবিরোধী শক্তির ঘাঁটিতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। এদিনের ঘটনায় ছাত্রদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও মারধরের অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, ছোট ছোট ছাত্রদের অপমানজনক মন্তব্য করা হয়েছে এবং তাঁদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এটাই কি ছাত্র রাজনীতির সংস্কৃতি?
একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিধায়ক। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কেন উপস্থিত ছিলেন না, তার জবাব দিতে হবে। ঘটনায় অভিযুক্ত কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তিনি দ্রুত তাঁদের পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের দাবি জানান। অন্যথায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
আক্রান্ত ABVP ছাত্রের বক্তব্য (Jadavpur University)
অন্যদিকে, ABVP-র এক আক্রান্ত ছাত্রের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে General Body বা GB ডাকা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, সেই বৈঠকে General Secretary বা GS এবং Assistant General Secretary বা AGS নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। ABVP ছাত্রটির বক্তব্য, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হলে নিজেদের মতো করে GS বা AGS তৈরি করা যায় না। তাই তাঁরা সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলিকে সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে চলার কথা বলেন।
তিনি দাবি করেন, এই বিষয়ে কথা বলতে গেলে তাঁদের সঙ্গে বচসা শুরু হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে ABVP-র মাত্র তিনজন ছাত্র ছিলেন। সেই সময় তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং পিছনে থাকা একটি পিলারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তাঁর চশমা ছিটকে পড়ে যায় বলেও দাবি করেন তিনি। আক্রান্ত ছাত্রটির আরও অভিযোগ, তাঁকে ছাড়াতে এগিয়ে আসা কয়েকজন সিনিয়র ছাত্রও হামলার মুখে পড়েন।
SFI রাজ্য সম্পাদকের বক্তব্য (Jadavpur University)
ঘটনার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন SFI পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে। তাঁর অভিযোগ, ABVP, RSS এবং বিজেপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃশংস হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি, অরবিন্দ ভবনে আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং ভবনটি ঘিরে ছাত্রছাত্রীদের মারধর করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই ঘটনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমনা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের উপর সরাসরি আক্রমণ। দেবাঞ্জন দে-র বক্তব্য, বিভিন্ন সময়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী চরিত্রকে দমানো যায়নি। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ফান্ড বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, ঘটনার আগে পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময়মতো কার্যকর ভূমিকা নেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, এর ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যত বিজেপির গুন্ডাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যাদবপুরের ছাত্র, শিক্ষক, অধ্যাপক ও অভিভাবকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এই ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। তাঁর দাবি, কোনও ধরনের আগ্রাসন বা অস্থিরতা তৈরি করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী চরিত্রকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
সৃজন ভট্টাচার্যের বক্তব্য (Jadavpur University)
SFI-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য দাবি করেন, তিনি কলকাতার বাইরে থাকায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির কয়েকজন ছাত্র নিজেদের মধ্যে সভা করছিলেন। সেই সময় ABVP-র সদস্যরা সেখানে গিয়ে প্ররোচনা ও অশান্তি তৈরির চেষ্টা করেন বলে তিনি দাবি করেন। সৃজনের বক্তব্য, ছাত্রদের মধ্যে বচসা হওয়া নতুন ঘটনা নয়। তবে পরবর্তীতে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ক্যাম্পাসে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

যাদবপুরের বিধায়কের বক্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, যদি ABVP-কে নিয়ে এত আস্থা থাকে, তাহলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করে তাদের গণতান্ত্রিকভাবে লড়াই করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না কেন? সৃজনের দাবি, নির্বাচনের মাধ্যমে যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরাই ঠিক করে দিক কোন ছাত্র সংগঠনকে তারা সমর্থন করবে। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন না করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়াও লেনিনের মূর্তি ভাঙার হুমকি এবং তা ঘিরে ক্যাম্পাসে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা কোনও রাজনৈতিক প্ররোচনায় পা দেবে না এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার পক্ষেই থাকবে।
আরও পড়ুন: Kidney Scam: কাজের প্রলোভনে লুধিয়ানা, ঘুম ভাঙতেই পেটে অস্ত্রোপচারের দাগ! উঠছে কিডনি চুরির অভিযোগ!

তিন বক্তব্যে স্পষ্ট বিভাজন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে ঘিরে তিন পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তিনটি ভিন্ন দাবি। বিধায়ক ও ABVP-র পক্ষ থেকে সরকারি সিদ্ধান্ত, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্যদিকে SFI-এর পক্ষ থেকে পুরো ঘটনাকে ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশের উপর রাজনৈতিক হামলা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে যাদবপুরের সাম্প্রতিক উত্তেজনার নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল, কে বা কারা প্রথম সংঘর্ষে জড়িয়েছিল এবং অরবিন্দ ভবনে আগুন বা ভাঙচুরের অভিযোগের সত্যতা কতটা তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।



