Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ছবি হয়তো পর্দায় দেখা যায়, কিন্তু তার জন্ম অনেক আগেই মনের ক্যানভাসে হয় (Jibanananda Das)। কোনও গল্প যখন শব্দের গণ্ডি পেরিয়ে দৃশ্য হয়ে ওঠে, তখন তার পিছনে কাজ করে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের সাধনা, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা। ‘ঘোষ ও মিত্র’ পরিচালিত ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’ যেন তেমনই এক নির্মাণ, যেখানে ছবি দেখার পাশাপাশি দর্শককে ছবির ভিতরে প্রবেশ পেরেছে।

এটি নিছক একটি ছোট ছবি নয়; বরং জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টিশীল মনোজগতের এক অদ্ভুত, অস্পষ্ট অথচ গভীর অনুসন্ধান। কোথাও রঙিন, কোথাও ধূসর, কোথাও সম্পূর্ণ সাদা-কালো, এই ছবির ভুবনে শৈশব, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, আকাঙ্ক্ষা, বোধ এবং অস্থিরতা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। ছবিটি বারবার মনে করিয়ে দেয়, ‘মাথার ভিতরে বোধ’ কাজ করলে মানুষের চারপাশের পৃথিবীটাও অন্যরকম হয়ে ওঠে।
‘ঘোষ ও মিত্র’-র ভাবনায় জীবনানন্দ (Jibanananda Das)
জীবনানন্দ দাশ এমন এক মানুষ, যাঁকে কোনও একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা কঠিন। তাঁর মধ্যে যেমন ছিল অতীতের ছায়া, তেমনই ছিল ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। তিনি একই সঙ্গে বাস্তবের মানুষ এবং নিজের নির্মিত এক অদৃশ্য জগতের বাসিন্দা। ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’ সেই জীবনানন্দেরই এক অজানা অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ এই সময়পর্বে যে সৃষ্টির বিস্ফোরণ তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসবে, তা হয়তো তিনিও তখন জানতেন না। উপন্যাস, গল্প, কবিতা—রক্ত, মাংস, ঘাম, ক্লান্তি এবং অন্তর্গত যন্ত্রণাকে কালি করে তিনি লিখে চলেছিলেন। তাই ছবিটি কেবল জীবনানন্দের জীবনের কোনও ঘটনার পুনর্নির্মাণ নয়। বরং একজন কবির অশরীরী সত্তার শারীরিক অভিজ্ঞতা, স্বাদ, গন্ধ, রং ও বোধকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা।

বোর্ডিংয়ের ঘর থেকে উঠে আসে এক অদ্ভুত পৃথিবী
এই ছবির অন্যতম শক্তি তার চরিত্র ও পরিবেশ নির্মাণে। ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’ যেন একটি নিজস্ব মহাবিশ্ব। সেখানে মানুষ যেমন আছে, তেমনই জড় বস্তুরও যেন নিজস্ব প্রাণ রয়েছে। কখনও কোনও টেকো শীতল মুচি, কখনও গালে বসন্তের দাগ নিয়ে নিমজ্জিত পানওয়ালি, কখনও বাসন মাজা ঝিয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়া কোনও শিক্ষিত মানুষ এই বিচিত্র চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে সমাজের নানা স্তর, তার অন্ধকার, বিকৃতি এবং স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা সামনে আসে। বোর্ডিংয়ের চৌবাচ্চায় কাকের এনে ফেলা মাছের নোংরা কানকো থেকে শুরু করে হেমন্তের শুকনো পাতা পিষে এগিয়ে চলা ট্রাম সবকিছুই যেন জীবনানন্দের চোখে অন্য এক অর্থ বহন করে। এমনকি গিরীন্দ্রশেখর বসুর বাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো হরিণের মাথাও হয়ে ওঠে এই অদ্ভুত জগতের এক নীরব সাক্ষী।
‘বোধ’: ছবির ভিতরের সবচেয়ে বড় শব্দ (Jibanananda Das)
জীবনানন্দের ‘বোধ’ কবিতার পংক্তি এই ছবির ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়, “সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে…” এই ‘সহজ’ হয়ে ওঠাই যেন সবচেয়ে কঠিন। মানুষ প্রতিদিন সমাজের নিয়ম মেনে চলে, নিজের চারপাশে কঠিন এক আস্তরণ তৈরি করে। অথচ সেই আস্তরণের নীচে লুকিয়ে থাকে এক অবুঝ শিশু, যে হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেমে যেতে চায়, মাঝরাতে ছাদে উঠে তারা গুনতে চায়, কালবৈশাখীর রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কফির উষ্ণতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায়। কখনও উদ্দেশ্যহীনভাবে একা হাঁটতে ইচ্ছে করে। কখনও কোনও কারণ ছাড়াই মনে হয়—আর একটু থাকি, আরও কিছুক্ষণ এই মুহূর্তটাকে অনুভব করি। ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’-এর দর্শনও যেন সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে।
সময়, স্মৃতি আর অদৃশ্য ক্ষত (Jibanananda Das)
সেকেন্ডের শব্দ শুনতে শুনতে কত রাত পেরিয়ে যায়। মিনিটের কাঁটা সামান্য থামে, ঘণ্টা পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। অথচ কিছু অভ্যাস মানুষের পাশে বসে থাকে ভালোবাসার মতো, কখনও ক্ষতের মতো। ডায়েরির পাতাগুলিও একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বছরের পর বছর জমে থাকা কথাগুলি সেখানে থেকে যায়। কিছু স্মৃতি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তাদের আঁচড় মনের ভিতরে স্পষ্ট। দিনের আলোয় হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসতে পারে। তার জন্য রাতের প্রয়োজন হয় না। জীবনানন্দের জগতের এই অন্ধকার কোনও বাহ্যিক অন্ধকার নয়; এটি মানুষের মনের ভিতরের অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যেই জন্ম নেয় ‘বোধ’।

এক অনন্ত অনুসন্ধান (Jibanananda Das)
ছবির এক পর্যায়ে মনে হয়, দিকশূন্য হয়ে দু’জন মানুষ ছুটে চলেছে। তারা মরিয়া হয়ে কিছু খুঁজছে। কিন্তু সন্ধান মিলছে না। আসলে তারা কী খুঁজছে? কোনও মানুষকে? কোনও স্মৃতিকে? ভালোবাসাকে? নাকি নিজেদেরই? এই প্রশ্নের উত্তর ছবিটি সরাসরি দেয় না। বরং দর্শককে নিজের মতো করে উত্তর খুঁজতে বাধ্য করে। এখানেই ছবিটির সৌন্দর্য। জীবনানন্দের চারপাশের পরিবেশ, মানুষ, বস্তু সবকিছুকে ছবিটি এমনভাবে ব্যবহার করে যে জড় জিনিসও যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। চেয়ার, দেওয়াল, জানলা, ট্রাম, শুকনো পাতা সবকিছুই যেন কবির অন্তর্জগতের অংশ।

আরও পড়ুন: Perfume: গন্ধকে সত্যিই বন্দি করা যায়! ‘পারফিউম’- সিনেমায় রয়েছে সেই রহস্য
ভালো-মন্দের বাইরে এক ‘বোধ’-এর অভিজ্ঞতা
কোনও ছবি দেখে যদি ঘরে ফিরে আসার পরও মনে হয়, আরও কিছুক্ষণ সেই ছবির মধ্যে থাকি, তাহলে বুঝতে হয় সেই ছবি শুধু চোখে ধরা দেয়নি মনের কোথাও গিয়ে স্পর্শ করেছে। ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’ তেমনই এক অভিজ্ঞতা। এখানে ভালো বা খারাপের সরল বিচার নেই। বরং আছে অনুভব করার জায়গা। আছে প্রশ্ন। আছে অস্বস্তি। আছে সৌন্দর্য। আছে অন্ধকার। আছে একাকিত্ব। আর সবকিছুর মাঝখানে আছে জীবনানন্দের সেই রহস্যময় ‘বোধ’। শেষ পর্যন্ত ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’ কোনও ছবির গল্প নয়, এ এক ছবির ভিতরে লুকিয়ে থাকা অনুভবের গল্প। ঘোষ ও মিত্র সেই গল্পকে কখনও শব্দে, কখনও দৃশ্যে, কখনও নীরবতায়, কখনও সংগীতের আবেশে সামনে এনেছেন।



