Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: লখনউয়ের ব্যস্ত খান্দারি বাজার যেখানে সকাল-সন্ধ্যা মানুষের আনাগোনা এক মুহূর্তের জন্যও থামে না (Delhi Blast)। দোকানের সামনে ঠাসাঠাসি ভিড়, খাবারের দোকানে ধোঁয়া উঠছে, রাস্তার ফুটপাথে সারি সারি দোকান। সেই ভিড়ের মধ্যেই একটা সরু গলি, আর গলির শেষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি তিনতলা হলুদ বাড়ি। বাইরে কাঠের দরজা, লোহার গ্রিল সবই তালাবদ্ধ। গত তিন দিন ধরে বাড়িটির সামনে উপস্থিত পুলিশ, মিডিয়া এবং জড়ো হওয়া কৌতূহলী মানুষের চোখে কেবল ভয় আর বিস্ময়ের ছায়া।এই বাড়িটি হঠাৎ করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ফরিদাবাদ বিস্ফোরক উদ্ধার কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত শাহিন শাহিদ আনসারি এবং তাঁর ভাই পারভেজ আনসারির নাম সামনে আসার পর। দু’জনই চিকিৎসক সমাজের দৃষ্টিতে এক সম্মানজনক পেশার মানুষ, অথচ তাঁদের বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয়েছে বিস্ফোরক, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, সন্দেহজনক ডিজিটাল ডিভাইস এবং জঙ্গি যোগের প্রমাণ। লখনউয়ের একটি গলি যেন মুহূর্তে পরিণত হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।

পারিবারিক স্বপ্নের ভেঙে যাওয়া প্রতিচ্ছবি (Delhi Blast)
পরিবারের বড় ছেলে মহম্মদ শোয়েব পেশায় প্রাইভেট টিউটর। তাঁর হতবাক বিস্ময় বোঝা যায় কারণ বাবা সৈয়দ আহমেদের স্বপ্ন ছিল তিন সন্তানই ডাক্তার হবে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর শেষ অক্ষয়টুকু শক্তি দিয়ে তিনি ছেলেমেয়েদের শিক্ষায় জোর দিয়েছিলেন। শোয়েবের চিকিৎসাবিদ্যায় আগ্রহ না থাকায় শাহিন ও পারভেজকে মন দিয়ে এগিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন বাবা। দু’জনই এমবিবিএস পাশ করে ডাক্তার হন যা পরিবারের গর্ব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই ডাক্তারই কি করে জৈশ-ই মহম্মদের মহিলা সেলের কম্যান্ডার হয়ে উঠলেন? পরিবার জানে না। সমাজ বোঝে না। প্রত্যেক অপরাধের পেছনে যেমন অদেখা একটা গল্প থাকে, শাহিন ও পারভেজের ক্ষেত্রেও সেই অজানা অন্ধকার পরতে পরতে সামনে আসছে।

বাড়ি থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া (Delhi Blast)
শাহিনের ব্যক্তিগত জীবনে ভাঙন ধরেছিল আগেই। চক্ষু বিশেষজ্ঞ জাফর হায়াতের সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। অনেকে বলেন বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা থেকেই সমস্যা। কিন্তু সত্যিটা বোন ও ভগ্নিপতির মধ্যেই বন্দি থেকে গেছে। পারভেজের ক্ষেত্রেও একইরকম দূরত্ব। বিহারের এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, একটি মেয়েও রয়েছে। কিন্তু তিনি এখন আলাদা থাকেন। দাদা শোয়েবই বললেন “ধীরে ধীরে ওদের থেকে দূরে চলে যায় পারভেজ”। ব্যক্তিগত জীবনের বিচ্ছেদ, মানসিক দূরত্ব, এবং পরিবার থেকে ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যাওয়া তদন্তকারীরা এখন এই পথটিকেই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখছেন। কারণ চরমপন্থায় জড়ানোর ক্ষেত্রে পরিবার-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা অনেক সময়ই প্রথম লক্ষণ।

সৌদি আরব ও মালদ্বীপের রহস্যময় অধ্যায় (Delhi Blast)
২০১৩-১৪ সালে সৌদি আরবে কাজের খোঁজে গিয়েছিলেন শাহিন। ২০১৬-তে মালদ্বীপে ছিলেন পারভেজ। বিদেশে এই কয়েক বছরের গোপন অধ্যায়ই এখন তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ঠিক কার সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁরা? কোন মতাদর্শের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন? জঙ্গি সংগঠনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে চিকিৎসকদের গুরুত্ব অনেক। কারণ তাঁরা শিক্ষিত, প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম, এবং সমাজের চোখে সন্দেহের ঊর্ধ্বে। ফলে বিদেশে তাঁদের যাত্রা এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।
চিকিৎসকের আড়ালে জঙ্গি নেটওয়ার্ক (Delhi Blast)
আল ফালাহ ইউনিভার্সিটির চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন শাহিন। ফরিদাবাদের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়ার পর তদন্তকারীরা খুঁজে পান দিল্লি বিস্ফোরণ কাণ্ডের মূল চক্রী উমর উন নবির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। চিকিৎসক ও অধ্যাপক পরিচয়ের আড়ালেই জঙ্গিদের ‘হোয়াইট কলার সেল’ তৈরি হচ্ছিল বলে সন্দেহ। ডাক্তারি পেশার আড়ালে এই ধরনের স্লিপার সেল গড়ে ওঠা সমাজের চোখে সবচেয়ে বিপজ্জনক ঘটনা। কারণ তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা সবচেয়ে বেশি। সেখানে যদি সন্ত্রাসবাদ মাথা তোলে, তা পুরো রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আরও পড়ুন: Sweta Bhattacharya: ছোটপর্দার ‘শ্যামলী’ কি ফিরতে পারবেন আগের মতো?
বাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতা ও বাইরের আতঙ্ক (Delhi Blast)
এখন বাড়িটির সামনে দাঁড়ালে দেখা যায় দু’জন কনস্টেবল টহল দিচ্ছেন। পরিবার নীরব। গেট খুলছে না। কেউ সামনে আসছেন না। গলির প্রতিবেশীরা কথা বলতে চান না। “চিনতাম না” বলে পাশ কাটিয়ে চলে যান। কেউ কেউ শুধু বাড়ির দিকে ইশারা করেন। তারপর নেমে আসে নীরবতা। একটি বাড়ি, যা একসময় ছিল চিকিৎসক পরিবারের সাধারণ আশ্রয় এখন যেন অঘটনের প্রতীক।



