Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ব্রাত্যজনের জীবনযাপন, বিশ্বাস, আনন্দ-বেদনার প্রকাশই মূলত লোকসংস্কৃতি (Tusu Festival)। শাস্ত্রীয় ধর্ম বা অভিজাত সংস্কৃতির বাইরে যে সমাজ বাউরি, বাগদি, ভূমিজ, কুর্মি, মাহাতো, সাঁওতাল প্রভৃতি শ্রমজীবী মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ সংস্কৃতিই লোকসংস্কৃতির প্রাণ। রাঢ়বঙ্গ তথা দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই লোকসংস্কৃতি আজও বহমান। ধর্মঠাকুর, শীতলা, মনসা, বনবিবি এই সব লৌকিক দেবদেবীর পূজার সঙ্গে সঙ্গে বাউলগান, কবিগান, লেটো, পঞ্চরস, ভাদু ও টুসু গান রাঢ় বাংলার সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এই লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল টুসু পার্বণ।

লোকবিশ্বাসের জননী (Tusu Festival)
টুসু কোনও শাস্ত্রীয় দেবী নন। তিনি গ্রামবাংলার মেয়েদের কণ্ঠে কণ্ঠে জন্ম নেওয়া এক লোকদেবী। কৃষিভিত্তিক সমাজে শস্য, উর্বরতা ও জীবনের পুনর্জন্মের সঙ্গে টুসু দেবীর ধারণা গভীরভাবে যুক্ত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি দ্রাবিড়-অস্ট্রিক ভাষাবর্গের কোল, মুন্ডা, ওরাওঁ, সাঁওতাল, ভূমিজ, ভুঁইয়া, কুর্মি, মাহাতো প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর আরাধ্য দেবী। টুসু মূলত নারীকেন্দ্রিক দেবী তাঁর পূজা, গান, বিসর্জন সবকিছুর প্রধান কারিগর গ্রামের মেয়েরাই।
‘টুসু’ নামের উৎপত্তি (Tusu Festival)
টুসু নামের উৎস নিয়ে লোকসমাজ ও গবেষকদের মধ্যে নানা মত প্রচলিত। একটি মতে, ধানের তুষ থেকেই টুসু শব্দটির জন্ম। শীতকালে গ্রামেগঞ্জে তুষ জ্বালিয়ে আঁচ পোহানোর রীতি রয়েছে, আর সেই তুষ দিয়েই টুসুর ডালি সাজানো হয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত পৌষালি উৎসব ‘তুষতুষালি ব্রতকথা’ এই মতকে সমর্থন করে। বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতোর মতে, ‘তুষ’ থেকেই ‘টুসু’। দীনেন্দ্রনাথ সরকার আবার মনে করেন তিষ্যা বা পুষ্যা নক্ষত্র থেকে, কিংবা ঊষা নামের সঙ্গে মিলিয়ে টুসু শব্দের উৎপত্তি। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন প্রজনন দেবতা ‘টেষুব’ থেকেও টুসু নামটির উদ্ভব ঘটেছে বলে এক মত প্রচলিত আছে। এই বহুমাত্রিক মতভেদই প্রমাণ করে টুসু কোনও একক ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে বন্দি নয় তিনি লোকজ বিশ্বাসের সম্মিলিত রূপ।
লিখিত নয়, স্মৃতির ভাণ্ডারে সংরক্ষিত (Tusu Festival)
টুসু গান কোনও লিখিত সাহিত্য নয়। প্রাচীন শ্যামা গানের মতোই এগুলি শ্রুতিনির্ভর শুনে শুনে মুখে মুখে বেঁচে থাকা গান। তাই টুসু গানের বয়স হাজার বছরেরও বেশি বলে মনে করেন লোকগবেষকেরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গানের কথা, সুর বদলেছে; সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন গানও তৈরি হয়েছে। রাঢ় বাংলার মানুষের জীবন-জীবিকা, সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম ও আন্দোলনের ইতিহাস এই গানগুলির মধ্যেই ধরা আছে।
রাঢ় বাংলার গ্রামজীবনে টুসু (Tusu Festival)
বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, হুগলি জেলার গ্রামাঞ্চলে টুসু পূজার প্রচলন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ঝাড়খণ্ডের সিংভূম অঞ্চল এবং ওপার বাংলার রাজশাহীতেও টুসু পরবের রীতি রয়েছে। বাঁকুড়ার পরকুল, পরেশনাথ, কেচন্দা, লক্ষ্মীসাগর, বীরপাট, সুইসা, মানবাজারের সিন্ত্রীর টুসুমেলা বহু প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
টুসু আরাধনার রীতি (Tusu Festival)
অগ্রহায়ণের শেষ দিন থেকে পৌষের শেষ দিন পর্যন্ত টুসু পূজা চলে। গ্রামের একান্নবর্তী পরিবারের মেয়েরা বা কয়েকটি পরিবারের অবিবাহিত মেয়েরা একত্র হয়ে প্রতি সন্ধ্যায় টুসু আরাধনা শুরু করে। নতুন ধানের গোছা মাথায় করে মাঠ থেকে আনা হয়। কুমোরদের তৈরি পোড়া মাটির খোলায় ধানের তুষ ভরে, তার উপর গাঁদাফুল সাজিয়ে তৈরি হয় টুসুখোলা। সন্ধ্যায় তুষের উপর রাখা হয় আলো-চাল, দূর্বাঘাস, সর্ষে, বাসক, আকন্দ ফুল। পাত্রে হলুদ টিপ পরিয়ে পিঁড়ির উপর বসিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। ভোগ হিসেবে থাকে চিঁড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা। এই আরাধনায় যোগ দেয় কচিকাঁচা থেকে শুরু করে বয়স্কা মহিলারাও। এটি এক ধরনের সামাজিক মিলনক্ষেত্র যেখানে গানই ভাষা, আর অনুভূতিই প্রার্থনা।
পৌষের শেষ চার দিন (Tusu Festival)
পৌষের শেষ চার দিন টুসু পার্বণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম দিন ‘চাউড়ি’ এদিন ঘরে ঘরে তৈরি হয় চালগুড়ি, উঠোন নিকোনো হয় গোবর-মাটি দিয়ে। দ্বিতীয় দিন ‘বাউড়ি’ নানা আকারের পিঠে তৈরি হয়, রাত জেগে আনন্দ চলে, আলোয় সাজে গোটা গ্রাম। এই দিনগুলোতে টুসু গান যেন জীবনের ছন্দ হয়ে ওঠে।
বিসর্জন ও গানের লড়াই (Tusu Festival)
মন্ত্রহীন এই পূজার শেষে পৌষসংক্রান্তির ভোরে টুসু দেবীকে চতুর্দোলায় বসিয়ে গান গাইতে গাইতে নিয়ে যাওয়া হয় নদী, দিঘি বা পুকুরে। বিসর্জনের পর স্নান সেরে, নতুন কাপড় পরে মেয়েরা গাইতে গাইতে গ্রামে ফেরে। এই সময় এক দলের সঙ্গে অন্য দলের গানের লড়াই চলে তরজার মাধ্যমে সামাজিক ব্যঙ্গ, আত্মসম্মান আর আনন্দ প্রকাশ পায়। টুসু বিসর্জনকে কেন্দ্র করে বহু জায়গায় বসে গ্রাম্য মেলা।
বিরল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ (Tusu Festival)
ঝাড়খণ্ড ও পুরুলিয়ার অধিকাংশ স্থানে টুসু মূর্তির প্রচলন নেই। তবে পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ও বাঁকুড়ার খাতড়ার পরকুল অঞ্চলে টুসু মূর্তি দেখা যায়। অশ্ব বা ময়ূরবাহিনী এই মূর্তিগুলি সাধারণত হলুদ রঙের গায়ে নীল শাড়ি পরিহিত। হাতে শঙ্খ, পদ্ম, পাতা বা বরাভয় মুদ্রা দেখা যায় যা লোককল্পনার বহুমাত্রিক রূপকে প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন: Saraswati Puja: সাবেকি বাগদেবী নয়, বাজিমাত কিউট সরস্বতীর?
ভাষা আন্দোলনে টুসু গান
১৯৫৩ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের সময়ে মানভূম অঞ্চলে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে টুসু গানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। লোকসংস্কৃতির এই মাধ্যম দিয়েই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাষাগত অধিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছিল। এতে প্রমাণিত হয়, টুসু গান শুধুই বিনোদন নয় এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার বাহকও।



