Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: এ বারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটে গেল বৃহস্পতিবার রাতে। এগিয়ে গিয়েও ইকুয়েডরের কাছে হেরে গেল জার্মানি।
নকআউট জার্মানি আর আইভরি কোস্ট
‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন’, এই বাংলা প্রবাদ আমাদের শোনা কিন্তু এর বাস্তব রূপ আমরা বিশ্ব মঞ্চে দেখলাম আবারও। যে দলকে কোনোভাবেই হয়ত জার্মানির সমান মনে হচ্ছিল না সেই দলের কাছে থামল জার্মানির প্রবল বিক্রম। ভাগ্যের পরিহাস নাকি জেদের আরেক নাম হয়ে থাকবে জার্মানির বিরুদ্ধে ইকুয়েডরের এই জয়? সেই তর্ক ছাড়া থাকল আপনাদের আর সময়ের হাতেই।
জার্মানি আর ইকুয়েডরের ম্যাচের আগে পর্যন্তও সবার হিসেবে এগিয়ে ছিল জার্মানি। যে জার্মানি হারার আগে হারে না, লড়াই করে জিতে যাওয়াই যাঁদের রক্তে সেই জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটিয়ে দিল ইকুয়েডর। ঠিক যেমন ছেলেদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে অঘটন ঘটিয়েছিল জিম্বাবোয়ে।
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটে গেল বৃহস্পতিবার রাতে (ভারতীয় সময় অনুযায়ী)। এগিয়ে গিয়েও ইকুয়েডরের কাছে হেরে গেল জার্মান বাহিনী। প্রথম দু’টি ম্যাচ জিতে আগেই নকআউট নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল জার্মানির। তাই বলা যায় এ যাত্রায় মান বাঁচল জার্মানির। নিউ জার্সির আকাশে শোনা গেল ইকুয়েডরের উল্লাস, যে উল্লাসের খবর আগে থেকে কেউ ঠাওর করতেও পারেনি। একদিকে যেমন ১-২ গোলে হার মানতে হল জার্মানিকে। অন্য ম্যাচে, কুরাসাওকে ২-০ হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করল আইভরি কোস্ট।
আরও পড়ুন: Himachal Cloud Burst Rain: মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হিমাচল!
জার্মানি বিশ্বকাপের অন্যতম বড় নামগুলির মধ্যে একটি। তবে ছোট দলের কাছে হার যেন তাঁদের একটা বদ অভ্যেস। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপকে বিদায় জানিয়েছিল জার্মান শিবির। এরপর ২০২২-এ জাপানের কাছে হার। এবার ১২ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠার পরেও গ্রূপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখ থুবড়ে পড়ল ইকুয়েডরের। লাতিন আমেরিকার একটা দেশের কাছে হারের হতাশা নিয়েই পরের পর্ব শুরু করবে জার্মানরা।
নিউ ইয়র্কের পাশাপাশি ইকুয়েডরের বহু মানুষ থাকেন নিউ জার্সিতে আর সেই কারণেই বৃহস্পতিবার রাতে মেটলাইফ স্টেডিয়াম কার্যত দিকে দিকে হলুদ জার্সির ছড়াছড়ি। সেই হলুদের ভিড়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখল জার্মানরা। স্টেডিয়ামের দখল এবং দিনের শেষে মাঠের লড়াই, দুই ক্ষেত্রেই তাঁরা পিছিয়ে গেলেন। রেফারি টোরি পেন্সো শেষ বাঁশি বাজাতেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দু’রকম দৃশ্য দেখা গেল। কেউ কেউ সঙ্গী বা সঙ্গীনীর কাঁধে মাথা দিয়ে বা গায়ে পতাকা জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলেন আবার কেউ মেতে উঠলেন বিজয় উল্লাস গর্বে। আবার আরেক এক দল আনন্দে নাচতে শুরু করে দিলেন। সেই সময় জয়ের আনন্দ এতটাই যে আশেপাশের কিছু নিয়ে তাঁদের কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। অন্যদিকে জার্মান সমর্থকদের মুখ চুন।
ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসিসি প্রথমে আনন্দে মাঠের ভেতরে ঢুকে প্লেয়ারদের জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়। তার পরেই গ্যালারিতে উঠে জড়িয়ে ধরলেন পরিবারের সদস্যদের। এ দিনের জয়ে বড় অবদান তো তাঁরও। গোটা ম্যাচে সাইডলাইনে চেঁচিয়ে, হাততালি দিয়ে, দৌড়োদৌড়ি করে গোটা দলকে উদ্বুদ্ধ করে গেলেন নিজের দলকে। বড় দলের বিরুদ্ধে খেলতে গেলে যে আগে মানসিকতা দৃঢ় করা প্রয়োজন সেটাই এই কোচ বুঝিয়ে দিলেন গোটা ম্যাচ জুড়ে। সিদ্ধান্ত দলের বিরুদ্ধে যাওয়ায় কার্ডের পরোয়া না করে রেফারির সঙ্গে তর্ক করলেন, জান লড়িয়ে দিলেন দলের জন্য। দিনের শেষে তাঁর মস্তিষ্কই জয় এনে দিল ইকুয়েডরকে। জার্মানির মতো বড় দলের সামনে গুটিয়ে থাকা নয়, বরং গোটা ম্যাচে দাপট দেখিয়ে জিতল ইকুয়েডর, আক্রমণ ছিল তাঁদের মূল ভাষা।
ম্যাচ শুরুর দুই মিনিটেই গোল করে এগিয়ে যায় জার্মানি। সেই মুহূর্তে মনে হয় এটাই তো প্রত্যাশিত। তবে এরপরেই বদলে যেতে থাকে ম্যাচের ছবি আর সব হিসেব। জার্মানির গোল নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বাঁ প্রান্তে থাকা ফ্লোরিয়ান উইর্ৎজের থেকে বল পেয়েছিলেন আলেকসান্ডার পাভলোভিচ। তিনি পা অনেকটাই উঠিয়ে বলটি রিসিভ করেন। হেড করতে গিয়ে ইকুয়েডরের এক ফুটবলারের মাথায় লাগে পাভলোভিচের পা। এর পর পাভলোভিচের পাস থেকে চলতি বলে শট নিয়ে গোল করেন লেরয় সানে।
আবারও এই ম্যাচে প্রশ্নের মুখে রেফারি এবং ভার-এর সিদ্ধান্ত। বুধবার রাতে সামান্য ফাউল করার জন্য বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল ভিনি-র গোল। এরপরেও প্রশ্ন উঠেছিল রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে। যদি সেটা বাতিল হয় তা হলে সানের গোল দেওয়া হল কোন যুক্তিতে? পা উপরে তুলে প্রতিপক্ষকে আঘাত করার ক্ষেত্রে হলুদ তো বটেই, লাল কার্ডও দেওয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনওটিই হল না। একই প্রশ্নের মুখে রয়েছেন মেসি।
যাই হোক বিতর্ক খেলার সঙ্গী। তবে এই ভাবে গোল হজমই হয়তো ইকুয়েডরের জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর পর কয়েক মিনিট তারা আক্রমণের ঝড় বইয়ে দেয় জার্মানির বক্সে এবং গোলও শোধ করে দেয়। এই গোল নিয়ে বিতর্কের জায়গা নেই। একের পর এক আক্রমণে জার্মানির রক্ষণ ভেঙে পড়ে। দূরপাল্লার শটে গোল করেন নেলসন আঙ্গুলো। তাঁর শট অভিজ্ঞ মানুয়েল নুয়েরকে পরাস্ত করে ফেলে।
এর পর বাকি ম্যাচে যা হল, তা জার্মানির বড় ভক্ত এবং নিন্দুক, কেউই হয়ত বিশ্বাস করতে পারবেন না। গোল করে ইকুয়েডরের আত্মবিশ্বাস এক লাফে বেড়ে তখন খেতাব জয়ের সমান। অন্যদিকে জার্মানির আত্মবিশ্বাস তলানিতে। গোটা মাঠে তখন ইকুয়েডরের দাপট। বল ঘোরাফেরা করছিল তাঁদের পায়ে। চাপের মুখে জার্মানির গোটা দলই কার্যত নীচে নেমে এসেছিল। সাত-আট জন মিলে রক্ষণ করছিলেন যাতে আর গোল না আসে। আক্রমণে উঠেও সুবিধা করতে পারছিল না জার্মানি। কিছু ক্ষণ পরেই ইকুয়েডরের কোনও ফুটবলার এসে বল কেড়ে নিচ্ছিলেন। পাশাপাশি, সানে, উইর্ৎজ, কাই হাভার্ৎজের জন্য ছিল জোনাল মার্কিং। অর্থাৎ বল পেলেই ঘেরাও হয়ে যাচ্ছিলেন ইকুয়েডরের কাছে।
জার্মানি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। গোল করার পর ইকুয়েডরের রক্ষণ এতটাই পোক্ত হয়ে ওঠে যে সেখান দিয়ে বল গলানো জার্মানির জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠে। জার্মানি দূরপাল্লার শটে ম্যাচ বের করার চেষ্টা করলেও সেটা সফলতা পায়নি। অন্যদিকে গতিতে অস্ত্র করে জার্মান বক্সে আক্রমণ চালাতে থাকে ইকুয়েডর। এতেই আসে দ্বিতীয় গোল। বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলই জয় এনে দিল ইকুয়েডরকে। শেষ গোলটিও সেটার নজির। কর্নার থেকে হেড ভেসে আসছিল নুয়েরের দিকে। জার্মান গোলকিপার বল ধরার আগেই পায়ের টোকায় জালে জড়িয়ে দেন গনজালো প্লাতা।
আধুনিক প্রজন্মের অন্যতম সেরা গোলকিপার, ইতিহাসের ওয়ান অব দ্যা বেস্ট এন্ড ফাইনেস্ট কিপার ম্যানুয়াল নয়ারকে। তাঁকে ট্রফি, খেতাব বা স্ট্যাট দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। মডার্ন ডে কিপারের ডেফিনেশনকে রিডিফাইনের ক্ষেত্রে তিনি একটা পাইওনিয়ার। এটা যেমন সত্যি তেমন এটাও আজ সত্যি হয়ে থাকল যে জার্মান দুর্গ আজ তিনি রক্ষা করতে পারলেন না।
অন্য ম্যাচে ইতিহাস লিখল আইভরি কোস্ট। দুই অর্ধে গোল করে আইভরি কোস্টকে প্রথম বার বিশ্বকাপের নকআউটে তুলে দিলেন নিকোলাস পেপে। গ্রুপে জার্মানির সঙ্গে সমান, ৬ পয়েন্ট হল আইভরি কোস্টের। তারা দ্বিতীয় স্থানে থেকে নকআউটে গেল। কুরাসাও অষ্টম দেশ হিসাবে ছিটকে গেল বিশ্বকাপ থেকে।


