Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সঙ্গীতের জগতে সাফল্যের কোনও শর্টকাট নেই। প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন নিরন্তর সাধনা, ধৈর্য এবং নিজের প্রতি অটুট বিশ্বাস (A. R. Rahman)। সেই কথাই যেন নিজের জীবনের মাধ্যমে প্রমাণ করলেন হুগলির সাহাগঞ্জের মেয়ে নীলাঞ্জনা ঘোষ দস্তিদার। একসময় জনপ্রিয় রিয়ালিটি শো সা রে গা মা পা-এর অডিশনে বাদ পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ব্যর্থতাই তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং নিজের ভুলগুলো শুধরে আরও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ তিনি পৌঁছে গিয়েছেন বলিউডে। পরিচালক ইমতিয়াজ আলির ছবিতে কিংবদন্তি সুরকার এ. আর. রহমানের সুরে গান গেয়ে এখন তিনি সংগীতপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সাহাগঞ্জের ছোট্ট বাড়ি থেকেই শুরু হয়েছিল সুরের যাত্রা
হুগলি জেলার চুঁচুড়া পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাগঞ্জের বাসিন্দা নীলাঞ্জনা ঘোষ দস্তিদারের বেড়ে ওঠা এক সঙ্গীতময় পরিবেশে। তাঁর বাবা সন্দীপন ঘোষ দস্তিদার পেশায় একজন বেস গিটারিস্ট এবং মা শ্রাবণী ঘোষ দস্তিদার একজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। ফলে ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে নিয়মিত গানের চর্চা, রেওয়াজ এবং বাদ্যযন্ত্রের সুর শুনেই বড় হয়েছেন তিনি। শুরুতে অবশ্য তাঁর মা তাঁকে নাচ শেখার জন্য ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু খুব অল্প বয়সেই নীলাঞ্জনা বুঝতে পারেন, তাঁর মন নাচে নয় গানেই। একদিন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আর নাচ শিখবেন না, গান শিখতে চান। মেয়ের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে পরিবারও তাঁকে সেই পথেই এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়। এরপর থেকেই শুরু হয় নিয়মিত সঙ্গীত সাধনা (A. R. Rahman)।
ব্যর্থতাকেই বানিয়েছেন সাফল্যের সিঁড়ি (A. R. Rahman)
অনেকের কাছেই রিয়ালিটি শো-তে বাদ পড়া মানেই স্বপ্নের ইতি। কিন্তু নীলাঞ্জনার কাছে সেটাই হয়ে উঠেছিল নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার প্রেরণা। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের গান শুনে গানকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। সেই ভালোবাসাকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। একাধিক রিয়ালিটি শো-র অডিশনে অংশ নিলেও নির্বাচিত হতে পারেননি। তবে তিনি কখনও ভাগ্যকে দোষ দেননি। বরং মনে করেছেন, তাঁর গানের মধ্যেই কোথাও না কোথাও ত্রুটি ছিল। তাই আরও বেশি রেওয়াজ, আরও বেশি অনুশীলনের পথই বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

‘মাস্কারা’ গান বদলে দিল জীবনের মোড়
সম্প্রতি নীলাঞ্জনার গাওয়া ‘মাস্কারা’ গানটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আর সেই গানই তাঁকে এনে দিয়েছে নতুন পরিচিতি। ২০২৪ সালে তিনি আমেরিকায় থাকাকালীন একদিন এ. আর. রহমানের সহকারীর কাছ থেকে ফোন পান। তাঁকে রহমানের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়। সেই সাক্ষাতে তাঁকে একটি গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথমে কিছুটা নার্ভাস লাগলেও সাহস সঞ্চয় করে গানটি গেয়ে শোনান তিনি। তখনও তিনি জানতেন না, তাঁর কণ্ঠই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবে। পরে যখন জানতে পারেন যে পরিচালক ইমতিয়াজ আলির ছবি ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-তে তাঁর গাওয়া গানই ব্যবহার করা হয়েছে, তখন আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নীলাঞ্জনার কথায়, এ. আর. রহমানের সুরে গান গাওয়ার সুযোগ তাঁর সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলির একটি। তবে তিনি এটাকে শেষ সাফল্য বলে মনে করেন না। তাঁর বিশ্বাস, শিল্পীর শেখার কোনও শেষ নেই। তাই আগামী দিনেও আরও নিষ্ঠার সঙ্গে রেওয়াজ চালিয়ে যেতে চান তিনি।
পরিবারই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি (A. R. Rahman)
নীলাঞ্জনার সাফল্যের পিছনে পরিবারের অবদান তিনি সবসময়ই স্বীকার করেন। বাবা-মায়ের পাশাপাশি তাঁর স্বামীও সঙ্গীতজগতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পরিবারের প্রত্যেকের কাছ থেকেই তিনি পেয়েছেন পূর্ণ সমর্থন ও উৎসাহ। তিনি মনে করেন, এই পারিবারিক পরিবেশ ও সহযোগিতাই তাঁকে এতদূর এগিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।

বাবার গর্ব—”এখন আমি মেয়ের কাছ থেকেই শিখি”
মেয়ে বলিউডে গান গেয়েছেন—এটাই যে একজন সঙ্গীতশিল্পী বাবার কাছে কত বড় গর্বের বিষয়, তা অকপটেই জানিয়েছেন সন্দীপন ঘোষ দস্তিদার। তিনি বলেন, ছোটবেলায় তিনিই মেয়েকে গান শেখাতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীলাঞ্জনার দক্ষতা এতটাই বেড়েছে যে এখন তিনিই মেয়ের কাছ থেকে নতুন অনেক কিছু শেখেন। একজন বাবা এবং সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে এই সাফল্যের মূল্য তিনি সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।
মায়ের চোখে কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার (A. R. Rahman)
মা শ্রাবণী ঘোষ দস্তিদারের কথায়, আজকের এই সাফল্য কোনও একদিনের নয়। বছরের পর বছর কঠোর অনুশীলন, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের ফল এটি। তিনি চান, তাঁর মেয়ে আগামী দিনে আরও বড় মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করুক এবং একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে নিজের জায়গা আরও সুদৃঢ় করুক।
আরও পড়ুন: Green Churi: শ্রাবণে সবুজ কাচের চুড়ি পরার রীতি কেন?

হুগলি থেকে বলিউড—বাঙালির গর্বের নতুন নাম
বাংলা থেকে বহু শিল্পী বলিউডে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হল আরও একটি নতুন নাম—নীলাঞ্জনা ঘোষ দস্তিদার। ব্যর্থতাকে সঙ্গী করে, নিরন্তর সাধনার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে স্বপ্ন যদি সত্যিই বড় হয়, তবে কোনও বাধাই শেষ কথা নয়।হুগলির সাহাগঞ্জের এই তরুণী আজ শুধু নিজের পরিবারের নয়, গোটা জেলার গর্ব। এ. আর. রহমানের মতো বিশ্ববন্দিত সুরকারের সুরে গান গেয়ে তিনি যেমন নতুন পরিচয় পেয়েছেন, তেমনি অসংখ্য তরুণ শিল্পীর কাছেও হয়ে উঠেছেন এক অনুপ্রেরণার নাম।



