Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতার প্রাণকেন্দ্র কলেজ স্ট্রিট শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি বাঙালির জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান প্রতীক (Gautam Mitra)। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বইপাড়ায় তৈরি হয়েছে অসংখ্য লেখক, গবেষক, শিক্ষক ও পাঠকের স্মৃতি। নতুন সরকার আসার পর কলেজ স্ট্রিটকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগকে ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রসঙ্গে নিজের মতামত জানিয়েছেন কবি, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক গৌতম মিত্র। একইসঙ্গে বহুদিন পর লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সম্ভাব্য কলকাতা প্রত্যাবর্তন নিয়েও তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন রয়েছে সাহিত্যপ্রেম, তেমনই রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবিকতা এবং বইকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার আবেদন।

কলেজ স্ট্রিট যেন তার নিজস্ব চরিত্র হারিয়ে না ফেলে
কলেজ স্ট্রিটের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে গৌতম মিত্র প্রথমেই স্পষ্ট করে দেন, সরকার বদলালেও বইয়ের গুরুত্ব বদলায় না। তাঁর কথায়, “যে সরকারই আসুক, যে সরকারই যাক, বই বইয়ের জায়গায় থাকবে।” তিনি জানান, গত ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে তিনি নিয়মিত কলেজ স্ট্রিটে আসছেন। বিশেষ করে পুরনো বইয়ের দোকানই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। তাঁর মতে, এত দীর্ঘ সময়ে তিনি কলেজ স্ট্রিটের মূল চরিত্রে তেমন বড় কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেননি। তিনি বিশ্বাস, কলেজ স্ট্রিটের প্রকৃত পরিচয় তার বই, পাঠক এবং মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ। তাই উন্নয়নের নামে যদি তার ঐতিহ্য নষ্ট হয়, তবে সেটি হবে বড় ক্ষতি। তিনি চান, আধুনিকীকরণ হোক, কিন্তু কলেজ স্ট্রিট যেন তার আত্মপরিচয় হারিয়ে না ফেলে।
‘বইকে রাজনীতির বাইরে রাখা হোক’ (Gautam Mitra)
আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর এই আবেদন, “কলেজ স্ট্রিট যেন কলেজ স্ট্রিটই থাকে, বই যেন বইয়ের জায়গাতেই থাকে। সেটা নিয়ে কেউ যেন পলিটিক্স না করে।” এই বক্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বই মানুষের চিন্তা, প্রশ্ন, গবেষণা ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘর্ষে বই বা বইপাড়া যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাঁর মতে, সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নীতিও বদলাতে পারে, কিন্তু বইয়ের জগতকে সব পক্ষেরই সমান মর্যাদা দেওয়া উচিত। কারণ সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র সমাজের সম্পদ।

তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গে সতর্ক ও সংযত অবস্থান
বহু বছর পর তসলিমা নাসরিনের সম্ভাব্য কলকাতা ফেরা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে গৌতম মিত্র অত্যন্ত সংযত ভাষায় নিজের মত প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করেন, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় এবং কয়েকটি বাক্যে এর বিচার করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো ধর্মের অনুসারী নন; বরং তিনি মানুষের মানবিকতায় বিশ্বাস করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়েছেন। তবে কোন লেখাকে ঘিরে কোথায় আপত্তি ছিল, সেই বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট মন্তব্য করতে চাননি। একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, কোনো লেখার মাধ্যমে কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করাও সমর্থনযোগ্য নয়। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে একটি ভারসাম্যের কথাই তুলে ধরেছেন।
‘শেষ পর্যন্ত বইয়েরই জয় হয়’ (Gautam Mitra)
গৌতম মিত্রের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ সম্ভবত এই দর্শন, “কোনো বইকেই আটকানো যায় না, কোনো বইকেই পোড়ানো যায় না।” তাঁর মতে, ব্যক্তি হিসেবে তসলিমা নাসরিন যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর সাহিত্যকর্ম। যদি তাঁর লেখা সত্যিই সাহিত্যমানসম্পন্ন হয়, তবে সময়ের পরীক্ষায় তা টিকে থাকবে। আর যদি না হয়, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই বিস্মৃত হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যকে সময়ের আদালতের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, কোনো লেখার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে পাঠক এবং ইতিহাস তাৎক্ষণিক বিতর্ক নয়।
সালমান রুশদির উদাহরণ টেনে সাহিত্যকেই প্রাধান্য
নিজের বক্তব্য আরও স্পষ্ট করতে গৌতম মিত্র ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখক সালমান রুশদির প্রসঙ্গও তুলে আনেন। তিনি জানান, একসময় জয়পুর সাহিত্য উৎসবে রুশদির আসার কথা ছিল। সেই সময় তিনি নিজেও জয়পুরে উপস্থিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রুশদি আসতে না পারায় তাঁর খারাপ লেগেছিল। কিন্তু পরে তিনি উপলব্ধি করেন, একজন লেখকের শারীরিক উপস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর লেখা। তাঁর ভাষায়, লেখক আসলেন কি এলেন না, সেটি বড় বিষয় নয়; বরং তাঁর রচনা পাঠকের কাছে পৌঁছাক এবং সংরক্ষিত থাকুক এটাই সবচেয়ে জরুরি। এই একই যুক্তি তিনি তসলিমা নাসরিনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন।
সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সময়ই (Gautam Mitra)
গৌতম মিত্রের মতে, কোনো সাহিত্যকর্মের স্থায়িত্ব নিয়ে আজই চূড়ান্ত রায় দেওয়া সম্ভব নয়। সময়ই নির্ধারণ করবে কোন লেখা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মূল্যবান হয়ে থাকবে। আজ তসলিমাকে ঘিরে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু কয়েক দশক পরে মানুষ হয়তো কেবল তাঁর লেখাকেই বিচার করবে। ব্যক্তিগত বিতর্ক ইতিহাসে মুছে যেতে পারে, কিন্তু শক্তিশালী সাহিত্য থেকে যায়।
আরও পড়ুন: College Street: উচ্ছেদ নয়, ‘মেকওভার’! বইপাড়া ঘুরে কী জানালেন অগ্নিমিত্রা?
গৌতম মিত্রের বক্তব্যে রাজনৈতিক মন্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সাহিত্য, মানবিকতা এবং মুক্ত চিন্তার মূল্যবোধ। কলেজ স্ট্রিট সম্পর্কে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন এটি কেবল একটি বাজার নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। তাই বইকে রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে তার স্বতন্ত্র মর্যাদা বজায় রাখা জরুরি।



