Last Updated on [modified_date_only] by Sumana Bera
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: নাজিরাবাদের বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড (Nazirabad Fire) কেড়ে নিল একাধিক তাজা প্রাণ। কিন্তু এই মৃত্যু কি স্রেফ দুর্ঘটনা, নাকি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরদারির অভাব? কেন বারবার অভিযোগ সত্ত্বেও সংরক্ষিত জলাভূমি এলাকায় গড়ে উঠল একের পর এক অপরিকল্পিত হ্যাঙ্গার? ১৮ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পাইলট ক্যাপ্টেন বি পার্থসারথি কেটিভি বাংলার প্রতিনিধি সুকৃতি ভট্টাচার্যর সামনে তুলে ধরেছেন চাঞ্চল্যকর বেশকিছু নথি।
সময় যত এগোচ্ছে, আনন্দপুরের মোমো কারখানা ও ডেকরেটার্স গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে (Nazirabad Fire) ততই বাড়ছে লাশের সারি। এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ। নিজেদের কাছের মানুষের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছেন আত্মীয়রা। পুলিশ ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে গোডাউনের মালিককে। কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ খতিয়ে দেখেছে কারখানার নকশা। কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ওই জমির চরিত্র।

ঘটনার সূত্রপাত ঠিক কীভাবে? এই জমির আমূল পরিবর্তন এবং কীভাবে একটি সংরক্ষিত জলাভূমি বাণিজ্যিক মরণফাঁদে পরিণত হল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য আমাদের সামনে এনেছেন ক্যাপ্টেন বি. পার্থসারথি, যিনি নিজেও ওই এলাকার বাসিন্দা। কোনও রাজনৈতিক কচকচানি নয়, বরং প্রশাসনিক নজরদারি এবং নিয়মের অবহেলার এক প্রামাণ্য দলিল এই প্রতিবেদন।
সবুজ ধ্বংসের প্রামাণ্য দলিল (Nazirabad Fire)
ক্যাপ্টেন পার্থসারথি যে নথি তুলে ধরেছেন, তা শিউরে ওঠার মতো। তাঁর দাবি, ২০১৮ সাল পর্যন্ত নাজিরাবাদ এলাকাটি ছিল সম্পূর্ণ ‘গ্রিনফিল্ড’। সারি সারি ঝিল, পুকুর আর গাছপালায় ঘেরা এই অঞ্চলটি ছিল পরিবেশের ফুসফুস। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় শুরু হয় জলাভূমি ভরাটের কাজ। তথ্য বলছে, গত ৬ বছরে এই সংরক্ষিত এলাকায় ৮০টিরও বেশি বিশালাকার ‘হ্যাঙ্গার’ বা গোডাউন তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের নজর এড়িয়ে রাতারাতি বদলে ফেলা হয়েছে জমির চরিত্র।
আরও পড়ুন:Nazirabad: কোথায় গেল ওরা? মায়ের চোখ খুঁজে ফেরে পোড়াবাড়ির চারধার
নাজিরাবাদের বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের (Nazirabad Fire) পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয় মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। সেখান থেকে তিনি দাবি করেন, জলাভূমি ভরাট করে গোডাউনগুলি তৈরি হয়েছিল বাম আমলে। কিন্তু মেয়রের এই অভিযোগকে কার্যত নস্যাৎ করে দিয়েছেন ক্যাপ্টেন পার্থসারথি। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ২০০৬ সালের আগে এখানে কোনও গোডাউন ছিল না, থাকলে তার প্রমাণ দিক প্রশাসন। তাঁর পাল্টা অভিযোগ, পুলিশ, পঞ্চায়েত এবং পরিবেশ দফতরকে বারবার লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনও ফল হয়নি। উল্টে চোখের সামনে আইনের তোয়াক্কা না করে একের পর এক বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে উঠেছে।
কেন এই অগ্নিকাণ্ড স্রেফ দুর্ঘটনা নয়?
নাজিরাবাদের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের (Nazirabad Fire) নেপথ্যে রয়েছে একাধিক সুরক্ষা বিধির চরম লঙ্ঘন:
অবৈধ নির্মাণ: ২০০৬-এর জলাভূমি আইন (EKW ACT) অনুযায়ী এই এলাকায় বাণিজ্যিক নির্মাণ নিষিদ্ধ। অথচ EKWMA-র নাকের ডগায় এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল বাণিজ্যিক হাব।
অগ্নিসুরক্ষার অভাব: কোনও গোডাউনেই ছিল না দমকলের বৈধ NOC। অথচ প্রতিটি হ্যাঙ্গারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
পথের কাঁটা: জলাভূমি ও খাল বুজিয়ে যাতায়াতের পথ সরু করে ফেলায় অগ্নিকাণ্ডের সময় দমকলের গাড়ি ঢুকতে চরম বাধার সম্মুখীন হয়।
সমাধানের পথ কোন দিকে?
এই রক্তস্নাত অধ্যায়ের পর প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসন কি এবার নড়েচড়ে বসবে? ক্যাপ্টেন পার্থসারথির মতে, এর একমাত্র প্রতিকার হল কঠোর আইনি পদক্ষেপ। জলাভূমি আইনের ১৮, ১৯ ও ২০ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিটি কাঠামোর ফায়ার ও ইলেকট্রিক্যাল অডিট বাধ্যতামূলক করা এবং যে আধিকারিকদের যোগসাজশে এই মরণফাঁদ তৈরি হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:Suvendu: শুভেন্দুর মিছিলে শর্তসাপেক্ষ অনুমতি হাইকোর্টের: মিছিলের পর জমায়েত কর্মসূচি বিজেপির
আনন্দপুরের মোমো কারখানা ও ডেকরেটার্স গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে (Nazirabad Fire) লাশের সারি বেড়েই চলেছে। নিখোঁজ বহু মানুষের আত্মীয়রা যখন হন্যে হয়ে প্রিয়জনের খোঁজ করছেন, তখন নাজিরাবাদের এই ‘বাণিজ্যিক মাফিয়া-রাজ’ প্রশাসনের দিকে হাজারো প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস কি সত্যিই সংরক্ষিত থাকবে, নাকি দুর্নীতির আগুনে পুড়ে ছাই হবে, তার উত্তর দেবে সময়।


