Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: গাজার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় প্রতিদিন সরাসরি সম্প্রচার করতেন তিনি। হাতের মাইক্রোফোনে ভর করে বিশ্বকে জানাতেন বোমা-গোলার আওয়াজের ভেতরে আটকে থাকা মানুষের কাহিনি(Gaza Journalist Killed)। সেই আনাস আল-শরীফ—মাত্র ২৮ বছর বয়সেই—রবিবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হলেন। একই সঙ্গে নিহত হন আল জাজিরার আরও চার কর্মী। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দা ও জবাবদিহির দাবিকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে।
গাজার সরাসরি সম্প্রচার করতেন শরীফ (Gaza Journalist Killed)
আনাস আল-শরীফ ছিলেন গাজার অন্যতম পরিচিত মুখ, বিশেষত অক্টোবর ২০২৩-এর পর থেকে, যখন ইসরায়েল বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে(Gaza Journalist Killed)। সেই সময় থেকে স্থানীয় সাংবাদিকদের ফুটেজ ও বর্ণনার ওপরই বিশ্বের নির্ভর করতে হয়েছে। খুব কম সময়েই আল-শরীফ হয়ে ওঠেন আরব বিশ্বের ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। যুদ্ধবিরতি, বন্দিমুক্তি, দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সরাসরি সম্প্রচার ছিল তাঁর কাজের মূল বৈশিষ্ট্য।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, নিজ শহর জাবালিয়ায় ইসরায়েলি হামলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আল জাজিরা তাঁকে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি ছিলেন পেশাদার ক্যামেরাপারসন, কিন্তু সহকর্মীদের অনুরোধে ক্যামেরার সামনে আসেন। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “স্থানীয় চ্যানেলে পর্যন্ত কখনও মুখ দেখাইনি, আন্তর্জাতিক চ্যানেল তো দূরের কথা। আমার বাবা সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন।” দুর্ভাগ্যবশত, নিয়োগ পাওয়ার কিছুদিন পরেই জাবালিয়ায় এক ইসরায়েলি হামলায় বাবাকে হারান তিনি(Gaza Journalist Killed)।
হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট খুলেও সম্প্রচার (Gaza Journalist Killed)
দুই সন্তানের পিতা আল-শরীফ প্রতিদিনই প্রায় সম্প্রচারে থাকতেন(Gaza Journalist Killed)। কখনও হাসপাতালের করিডোরে, কখনও গাড়ির ভেতরে, কখনও বা আশ্রয়কেন্দ্রের মেঝেতে—তিনি বলেছিলেন, “আমি ৩০ থেকে ৪০টি ভিন্ন জায়গায় ঘুমিয়েছি।” ২০২৪ সালের জানুয়ারির এক স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময় সরাসরি সম্প্রচারে তিনি নিজের হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট খুলে ফেলেন। ভিড় তাঁকে কাঁধে তুলে উদযাপন করে। তখন তিনি বলেছিলেন, “আমি খুলে ফেলছি এই হেলমেট, যা আমাকে ক্লান্ত করেছে, আর এই বর্ম, যা আমার শরীরের অংশ হয়ে গেছে।”
তাঁর এই সাহসিকতা ও জনপ্রিয়তা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নজর কাড়ে। আল-শরীফ দাবি করেছিলেন, তাঁকে কাজ বন্ধ করতে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। একবার এক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপে তাঁকে বার্তা দিয়ে বলেন, “তুমি যেখানে আছো, কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখান থেকে দক্ষিণে চলে যাও, আল জাজিরার জন্য রিপোর্টিং বন্ধ করো।” তখন তিনি এক হাসপাতাল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন। কিছুক্ষণ পরেই তাঁর অবস্থানকৃত কক্ষটি হামলায় ধ্বংস হয়(Gaza Journalist Killed)।

হামাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ (Gaza Journalist Killed)
ইসরায়েলি সেনারা প্রায় দশ মাস আগে তাঁকে হামাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ তোলে(Gaza Journalist Killed)। অক্টোবর ২০২৪-এ তারা তথাকথিত ‘প্রমাণপত্র’ প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয়, আল-শরীফ ২০১৩ সালে হামাসে যোগ দেন এবং ২০১৭ সালে প্রশিক্ষণে আহত হন। এই অভিযোগ তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছিলেন, যেমনটি অস্বীকার করেছেন জাতিসংঘের মতপ্রকাশ স্বাধীনতার বিশেষ প্রতিবেদক ইরিন খান। গত মাসে তিনি লিখেছিলেন, “আমি একজন সাংবাদিক, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। আমার একমাত্র লক্ষ্য সত্যকে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা।”
নিহতের কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu ) ঘোষণা করেছিলেন যে, বিদেশি সাংবাদিকদের গাজায় ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে, তবে শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর অনুমোদন ও তত্ত্বাবধানে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের ‘এম্বেড’ নীতি স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা।

আরও পড়ুন : SC On Stray Dogs : পথকুকুর মুক্তের পর এবার রাজধানীর রাস্তায় খাবার ফেলা নিয়েও সুপ্রিম নির্দেশ
‘প্রেস’ চিহ্নিত তাঁবুর ভেতরে হত্যা (Gaza Journalist Killed)
আল-শরীফকে গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের প্রবেশপথে স্থাপিত একটি ‘প্রেস’ চিহ্নিত তাঁবুর ভেতরে অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে হত্যা করা হয়(Gaza Journalist Killed)। হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবু সালমিয়া জানিয়েছেন, হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আল জাজিরা প্রতিবেদক মোহাম্মদ কুরেইকেহ, আলোকচিত্রী ইব্রাহিম আল তাহের, মোয়ামেন আলিওয়া এবং স্টাফ সদস্য মোহাম্মদ নুফাল।
আল জাজিরা এক বিবৃতিতে হামলাটিকে “সাংবাদিকদের ওপর ইচ্ছাকৃত আঘাত” বলে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে) বলেছে, তারা ‘স্তম্ভিত’। সংগঠনটি জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৯২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৮৪ জনই ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি হামলায় নিহত(Gaza Journalist Killed)।
ইসরায়েল গত বছর নতুন যুদ্ধকালীন আইন ব্যবহার করে আল জাজিরার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, যা সরকারকে এমন যেকোনো বিদেশি সংবাদমাধ্যম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ‘ক্ষতিকর’ বলে বিবেচিত হয়(Gaza Journalist Killed)।
গাজার বহু মানুষের কাছে আল-শরীফ ছিলেন কেবল একজন সাংবাদিক নন, বরং এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত ইচ্ছাপত্রে তিনি লিখেছিলেন, “আমি যন্ত্রণাকে সব রূপে অনুভব করেছি, বহুবার ক্ষতি ও কষ্ট সহ্য করেছি, তবু সত্যকে বিকৃত না করে তুলে ধরতে কখনও দ্বিধা করিনি। যদি আমি মারা যাই, আমি মরব আমার নীতিতে অটল থেকে। গাজাকে ভুলে যেয়ো না… আর আমাকেও ক্ষমা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য তোমাদের প্রার্থনায় রেখো।”


