Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল : ভারত-চিন সীমান্ত সংঘাতের ইতিহাস বলতে গেলে অধিকাংশ মানুষই মনে করেন ১৯৬২ সালের পরাজয়ের কথা অথবা সাম্প্রতিক গালওয়ান সংঘর্ষের প্রসঙ্গ(India China Conflict)। কিন্তু এর মাঝেই এমন একটি অধ্যায় আছে, যা অনেকটাই বিস্মৃত—১৯৬৭ সালের নাথু লা ও চো লা যুদ্ধ। এই সংঘর্ষ শুধু ভারতের সেনাবাহিনীর আত্মবিশ্বাস ফেরায়নি, বরং ভবিষ্যতের কূটনীতি, কৌশল ও যুদ্ধনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৬২ সালের পরাজয়ের ছায়া (India China Conflict)
১৯৬২ সালের চিন-ভারত যুদ্ধ ভারতীয় সেনাবাহিনীর (Indian Army) জন্য ছিল এক তীব্র লজ্জাজনক অধ্যায়(India China Conflict)। প্রায় ১৪,৫০০ বর্গ মাইল এলাকা হারায় ভারত। নিহত হয় ১৩০০-রও বেশি সেনা। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পর্যন্ত স্বীকার করেছিলেন যে দেশ “একটি কৃত্রিম আশ্বাসে” বেঁচে ছিল। এই পরাজয় গোটা সেনাবাহিনী ও রাজনীতিক নেতৃত্বের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল।
কিন্তু ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং লালবাহাদুর শাস্ত্রীর দৃঢ় নেতৃত্ব পরিস্থিতি কিছুটা বদলায়। পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা পায় নতুন সমর্থন ও কৌশলগত দিকনির্দেশ। তবে চীনের আগ্রাসী মনোভাব থেকে উত্তেজনা থামেনি। বিশেষত সিকিম সীমান্তে নিয়মিত উস্কানি চলতেই থাকে।
বিতর্কিত সিকিম সীমান্ত ও ভূ-রাজনীতি(India China Conflict)
১৯৬৭ সালে সিকিম ভারতের একটি প্রোটেক্টরেট হলেও, চীন একে নিজের ‘পাঁচ আঙুল’ তত্ত্বের অংশ মনে করত(India China Conflict)। পিকিং (বর্তমান বেইজিং) প্রকাশ্যে দাবি করত যে নাথু লা ও চো লা আসলে চীনের এলাকা। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাও সেতুং-এর প্রভাবে চীনের সেনাবাহিনী আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
ভারত তখন সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করে, যা চীনা সেনারা সরাসরি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন : Sam Pitroda : পড়শি দেশেই ফোকাস হোক ভারতের পররাষ্ট্রনীতি, ফের বিতর্কে স্যাম পিত্রোদা
নাথু লা যুদ্ধ ১১–১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭(India China Conflict)
১১ সেপ্টেম্বর সকালে ভারতীয় সেনারা যখন বেড়া দেওয়ার কাজ করছিল, তখন চীনা সেনারা বাধা দেয়(India China Conflict)। বিতর্ক চলতে চলতেই আচমকা গুলি চালায় পিএলএ (PLA)। ভারতীয় গ্রেনেডিয়ার ইউনিটের কম্যান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাই সিং গুলিতে নিহত হন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ভারতীয় সেনারা। জওয়ানরা আক্রমণ চালায়, আর মেজর জেনারেল সাগত সিং সিদ্ধান্ত নেন যে আর কোনো সংযম নয়। ভারতীয় আর্টিলারি তখন ভয়ঙ্কর আঘাত হানে চীনা বাঙ্কারের উপর।
তিন দিন ধরে চলা লড়াইয়ে ভারতীয় সেনারা ৩ ইঞ্চি ও ২৫ পাউন্ডার গান থেকে নির্ভুল গোলাবর্ষণ চালায়। চীনা বাঙ্কার ও অবস্থান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ চীনা সেনা নিহত হয়, যেখানে ভারতের ক্ষতি হয় ৮৮ জন জওয়ান।
চো লা যুদ্ধ ১ অক্টোবর ১৯৬৭(India China Conflict)
নাথু লার পর হাল ছাড়েনি চীনা সেনারা। ১ অক্টোবর তারা আবার চেষ্টা করে চো লা পাসে(India China Conflict)। ভোরের কুয়াশায় আচমকা আক্রমণ চালায় তারা। কিন্তু এবার সামনে ছিলেন গোরখা রাইফেলসের বীর জওয়ানরা।
কর্নেল কুল ভূষণ জোশি আগেই বলেছিলেন, “চীনারা যদি এগোয়, তবে তাদের খুকরি দিয়েই উত্তর দেওয়া হবে।” কথাটি সত্যি হয়। গোরখারা রক্ত গরম করে হাতাহাতি যুদ্ধে নেমে পড়েন। খুকরির আঘাতে চীনারা পিছু হটে যায়।
রাইফেলম্যান দেবীপ্রসাদ লিম্বুর মতো বীরদের কাহিনি আজও সেনা ইতিহাসে অনন্য। তিনি খুকরি হাতে চীনা লাইট মেশিন গানারকে নিধন করেন যুদ্ধক্ষেত্রেই।
চো লা যুদ্ধে ভারতীয় সেনারা শুধু আক্রমণ ঠেকানই নয়, বরং চীনাদের কয়েক কিলোমিটার পিছু হটতে বাধ্য করেন।

আরও পড়ুন : WB BJP : ২৬-এর নির্বাচনের আগে বদল বিজেপির সংগঠনে,কোন গোষ্ঠীর হাতে থাকবে নিয়ন্ত্রণ?
কৌশলগত প্রভাব(India China Conflict)
এই দুটি লড়াই শুধু সীমান্ত রক্ষা করেনি, বরং তিনটি বড় পরিবর্তন ঘটায়—
- মনোবল পুনরুদ্ধার – ১৯৬২ সালের পরাজয়ের ক্ষত মুছে যায়। সেনাবাহিনীর আত্মবিশ্বাস নতুনভাবে ফিরে আসে(India China Conflict)।
- চীনের কৌশল বদল – ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের মিত্র চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। ১৯৬৭-র অভিজ্ঞতা থেকে তারা ভারতের ক্ষমতা বুঝেছিল।
- সীমান্তে স্থিতাবস্থা – সিকিম সীমান্ত দীর্ঘ সময় শান্ত থাকে। ১৯৭৫ সালে সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় বিনা বাধায়।
সোভিয়েত চাপ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ঐ সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের উপর সামরিক চাপ বাড়ায়(India China Conflict)। মানচুরিয়া সীমান্তে সোভিয়েত সেনা জড়ো করে, ট্যাঙ্ক মোতায়েন করে। ফলে চীন ভারত-সীমান্ত সংঘাত বড় আকারে বাড়াতে পারেনি।
মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস সেই সময়ে এই সংঘাতকে বর্ণনা করেছিল “হিমালয়ের রণক্ষেত্রের গলিপথ যুদ্ধ” বলে।
বিস্মৃত অধ্যায় কেন?
যদিও এই বিজয় ভারতের জন্য কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এক মাইলফলক, তবুও তা জাতীয় স্মৃতিতে জায়গা পায়নি(India China Conflict)। কারণ হয়তো রাজনৈতিকভাবে এই সাফল্যকে তেমন প্রচার দেওয়া হয়নি। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও ১৯৬২ বা ১৯৭১-এর মতো জায়গা পায়নি ১৯৬৭।
তবে আজকের দিনে যখন গালওয়ান সংঘাত বা ডোকলাম ইস্যুতে ভারত-চীন সম্পর্ক আবার আলোচনায়, তখন নাথু লা ও চো লার যুদ্ধ নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়।
১৯৬৭ সালের নাথু লা ও চো লার যুদ্ধ ভারতের সীমান্ত সুরক্ষার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই সময়কার সাহস, কৌশল ও দৃঢ় নেতৃত্ব ভারতের ভবিষ্যৎ যুদ্ধনীতিকে প্রভাবিত করেছিল(India China Conflict)।
আজ ৫৮ বছর পরেও এই যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রস্তুতি, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনও প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব।


