Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সদ্য কলকাতার সাহেবপাড়ার জীবন, শহরের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মানুষের স্বপ্নভঙ্গ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নিঃসঙ্গতার কাহিনি এই সবকিছুকে এক অনন্য শিল্পরূপ দিয়েছিলেন ‘চৌরঙ্গী’-র স্রষ্টা শংকর (Mani Shankar)। প্রকৃত নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল এক যুগস্রষ্টা কথাশিল্পীকে, যিনি পাঠকের হৃদয়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অম্লান ছিলেন।

আত্মপ্রকাশ (Mani Shankar)
১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম শংকরের। শৈশবের কিছুটা সময় কাটে সেখানেই, পরে পরিবার নিয়ে চলে আসেন হাওড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়, জাপানি আক্রমণের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে জীবনের শুরু থেকেই ছিল টানাপোড়েন। স্বাধীনতার বছরেই পিতৃবিয়োগ তাঁর জীবনে নামিয়ে আনে গভীর অন্ধকার।
অল্প বয়সেই জীবিকার তাগিদে তাঁকে করতে হয়েছে নানা কাজ কেরানি, গৃহপরিচারক, এমনকি হকারিও। এই কঠিন বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখার ভিত গড়ে দেয়। রিপন কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থই তাঁকে সাহিত্যমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে।

‘চৌরঙ্গী’: এক শহরের অন্তরাল ইতিহাস (Mani Shankar)
বাংলা সাহিত্যে হোটেল-জীবনকে কেন্দ্র করে এমন বিশদ ও মানবিক উপন্যাস বিরল। ‘চৌরঙ্গী’ শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি সদ্য স্বাধীন কলকাতার সাহেবপাড়ার সামাজিক দলিল। পাঁচতারা হোটেলের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কর্মচারীদের স্বপ্ন, অপমান, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক মানবজীবনের চিত্র।
উপন্যাসটি পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়, যেখানে স্যাটা বোসের চরিত্রে অভিনয় করেন মহানায়ক উত্তম কুমার। এই চলচ্চিত্র উপন্যাসটির জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ‘চৌরঙ্গী’-র ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া বাংলা সাহিত্যে এক বিরল ঘটনা।

এক সৃজনসম্ভারের বিস্তার (Mani Shankar)
শংকরের সাহিত্যজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক তাঁর রচনার চলচ্চিত্রায়ন। কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই দুই ছবি আন্তর্জাতিক পরিসরেও সমাদৃত হয়। শংকর নিজে একবার বলেছিলেন, “সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।” এছাড়া ‘কত অজানারে’ নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সাহিত্য ও সিনেমার এই মেলবন্ধন শংকরের সৃষ্টিকে আরও ব্যাপক পাঠক-দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
লেখনভঙ্গির বৈচিত্র্য ও ভাবনার গভীরতা (Mani Shankar)
শংকর কেবল জনপ্রিয়তার লেখক নন, তিনি বিষয় ও আঙ্গিকে ছিলেন বৈচিত্র্যময়। সত্তরের দশকের অশান্ত কলকাতাকে কেন্দ্র করে লেখা ‘স্থানীয় সংবাদ’, ‘সুবর্ণ সুযোগ’ প্রভৃতি উপন্যাসে উঠে এসেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক টানাপোড়েন। ‘বোধোদয়’ প্রকাশের পর তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেন “ব্রাইট, বোল্ড, বেপরোয়া।” বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শন নিয়ে তাঁর রচনাগুলিও দীর্ঘদিন বেস্টসেলার ছিল। ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও মানবচিন্তার গভীর প্রশ্ন সব ক্ষেত্রেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

সাহিত্য অ্যাকাডেমি স্বীকৃতি (Mani Shankar)
২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য তিনি পান সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। যদিও অনেক সাহিত্যপ্রেমীর মতে, এই সম্মান তাঁর প্রাপ্যের তুলনায় অনেক দেরিতে এসেছে। ‘চৌরঙ্গী’-র মতো যুগান্তকারী রচনার পরও তথাকথিত মূলধারার স্বীকৃতি সহজে মেলেনি তাঁর।
আরও পড়ুন: Kolkata: কবীর সুমনের উদ্বোধনে একুশের বইমেলা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে লায়েলকা মাঠে
সর্বভারতীয় সাহিত্যিক হিসেবে শংকর
ভাষার সীমানা পেরিয়ে জনপ্রিয়তা খুব কম লেখকের ভাগ্যে জোটে। অথচ একান্ত বাঙালি জীবনানুভব নিয়েই শংকর হয়ে উঠেছিলেন সর্বভারতীয় সাহিত্যিক। তাঁর রচনায় মধ্যবিত্তের সংগ্রাম, শহুরে একাকীত্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভাঙনের যে বাস্তব চিত্র উঠে আসে, তা সর্বভারতীয় পাঠককেও স্পর্শ করে। পাঠকের ভালবাসাই ছিল তাঁর আসল পুরস্কার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিনি থেকে গেছেন বইয়ের পাতায়, স্মৃতির ভাঁজে, শহরের আলো-ছায়ায়।



