Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলা তথা জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ মুকুল রায় আর নেই (Mukul Roy)। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার পর নিউ টাউনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার গভীর রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ (বা ৭৩) বছর। তাঁর প্রয়াণে রাজ্য রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। হাসপাতালের সামনে ভিড় করেন তাঁর অনুগামীরা, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকবার্তায় ভরে ওঠে রাজনৈতিক মহল।

শৈশব থেকে রাজনৈতিক উত্থান (Mukul Roy)
ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনীতির ময়দানে প্রবেশ করেন মুকুল রায়। উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়া থেকে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৯৮ সালে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পাশে দাঁড়ান মুকুল রায়।
দল গঠনের পর থেকেই তিনি সংগঠনের ভিত মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক কৌশলের জন্য দ্রুতই তিনি ‘তৃণমূলের চাণক্য’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
দিল্লির মসনদে (Mukul Roy)
রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেন মুকুল রায়। তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হন এবং কেন্দ্রের ইউপিএ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। তিনি রেল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং নৌপরিবহন মন্ত্রকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও কৌশলী রাজনৈতিক চালের জন্য তাঁকে দলের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ বলা হতো।

বিতর্ক, দলবদল ও প্রত্যাবর্তন (Mukul Roy)
মুকুল রায়ের রাজনৈতিক জীবন যেমন উজ্জ্বল, তেমনই বিতর্কিতও। ২০১৭ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে যোগ দেন ভারতীয় জনতা পার্টি-তে। তাঁর এই সিদ্ধান্তে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনের কিছুদিন পরই আবার পুরনো দল তৃণমূলে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক। দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের দাবি ওঠে, তবে তিনি ইস্তফা দেননি।
এই পর্বে তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। অনেকেই মনে করেন, এই সিদ্ধান্তগুলিই তাঁর দীর্ঘদিনের ‘চাণক্য’ তকমায় কিছুটা ছায়া ফেলেছিল।
জীবনের শেষ অধ্যায় (Mukul Roy)
গত কয়েক বছর ধরে কিডনি-সহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন মুকুল রায়। তিনি ডায়াবিটিস ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ২০২১ সালে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন জনসমক্ষে দেখা যায়নি তাঁকে। অবশেষে নিউ টাউনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনের ইতি ঘটে। তাঁর পুত্র শুভ্রাংশু রায় জানিয়েছেন, রবিবার রাত দেড়টা নাগাদ তিনি প্রয়াত হন। পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর শেষকৃত্য পারিবারিক ভাবেই সম্পন্ন হবে।

আরও পড়ুন: Suniti Kum ar Chatterjee: মহাগ্রন্থের শতবর্ষ! ‘ও-ডি-বি-এল’এই বই বাঙালির আত্মপরিচয়ের শিকড়
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
মুকুল রায়ের জীবন এক বর্ণময় রাজনৈতিক কাহিনি। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান থেকে শুরু করে তৃণমূলের উত্থান—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব। সাংগঠনিক দক্ষতা, কূটনৈতিক কৌশল এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার জন্য তিনি দীর্ঘদিন বঙ্গ রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন।
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়কেবল ক্ষমতার খেলা নয়, এটি সময়, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তের জটিল সমীকরণ। এক সময়ের ‘বঙ্গ চাণক্য’ হয়তো শেষ অধ্যায়ে অনেকটাই নীরব হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



