Last Updated on [modified_date_only] by Sumana Bera
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতের মহিলা ক্রিকেট যখনই কোনও কঠিন লড়াইয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়, প্রত্যাশার সব আলো যেন এসে পড়ে বাংলার এক মেয়ের ওপর — রিচা ঘোষ (Richa Ghosh)। একসময় যাকে শিলিগুড়ির মহল্লায় অনেকে বলত ‘লক্ষ্মীছাড়া’, সেই বাউন্ডুলে মেয়ে আজ কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর নয়নের মণি। প্রত্যাশার ভার আজ আকাশছোঁয়া। জেমিমা, হরমনপ্রীতরা রয়েছেন, কিন্তু আসল আস্থার জায়গা আজ এই বাঙালি উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। কারণ, সেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধেই তাঁর ব্যাট থেকে জন্ম নিয়েছিল এক বিশ্বরেকর্ড, যা তাঁকে এনে দিয়েছে ‘বিগ ম্যাচ প্লেয়ার’-এর তকমা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে রিচার (Richa Ghosh) ঐতিহাসিক ইনিংস
অপেক্ষার কারণ স্পষ্ট। সদ্য সমাপ্ত একটি লিগ পর্বের ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ব্যাট হাতে রীতিমতো ইতিহাস তৈরি করেছিলেন রিচা। যখন ভারতীয় দল ৬ উইকেটে মাত্র ১০২ রানে ধুঁকছিল, ঠিক তখনই মাঠে নামেন তিনি। তারপরের চিত্রনাট্য যেন এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। একাই খেলার রং পাল্টে দিয়েছিলেন রিচা (Richa Ghosh)। তাঁর ঝড় তোলা ইনিংসে ভারত পৌঁছে গিয়েছিল ২৫২ রানের সম্মানজনক স্কোরে। ব্যক্তিগতভাবে ৯৪ রানের এক চোখ ধাঁধানো ইনিংস খেলে তিনি গড়েছিলেন নতুন রেকর্ড — অষ্টম ব্যাটার হিসেবে এত বড়ো স্কোর করার বিশ্বরেকর্ড। সেই ইনিংসের পর আবারও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ঝলসে উঠল রিচার ব্যাট।
এমনকি সেমিফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও, যখন আস্কিং রান রেট মাথায় চেপে বসেছিল এবং দল ঘনঘন উইকেট হারাচ্ছিল, তখনও রিচার ব্যাট থেকেই এসেছিল সেই জরুরি ‘ঝোড়ো ইনিংস’। তাঁর সাহসিকতা আর মারমুখী ব্যাটিং ভারতকে এনে দিয়েছিল কঠিন পরিস্থিতিতে আশার আলো। বাংলার এই মেয়ের ব্যাটিংয়ে ভর করেই দল জয়ের পথে পা বাড়ানোর সাহস পেয়েছিল।
টেবিল টেনিস থেকে ২২ গজের জেদ
তবে রিচার এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের রাস্তা মোটেই মসৃণ ছিল না। এই রিচাই (Richa Ghosh) একসময় ছিলেন শিলিগুড়ির এক জেদি ছোট্ট মেয়ে। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই তাঁর একমাত্র জেদ ছিল ক্রিকেট খেলা। খেলার পরিকাঠামো বা স্থানীয় সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও তাঁর মুখে ছিল একটাই কথা— “বাবা, চলো মাঠে।” বাবার মতোই ভারি ব্যাট তুলে ছক্কা হাঁকানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

রিচার বাবা, মানবেন্দ্র ঘোষ। শুরুতে চেয়েছিলেন মেয়ে বরং টেবিল টেনিস খেলুক। কারণ শিলিগুড়িতে মেয়েদের ক্রিকেটের পরিকাঠামো ছিল না বললেই চলে। কিন্তু মেয়ের একরোখা জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন তিনি। সমাজের বড়োদের আপত্তি সত্ত্বেও বাবার নিজের অসম্পূর্ণ ক্রিকেট স্বপ্নকে মেয়ের হাতে তুলে দিলেন। মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে মানবেন্দ্রবাবু প্রমাণ করলেন, স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিকাঠামোর অভাব নয়, প্রয়োজন শুধু জেদ আর বাবার সমর্থন।
ঝুলন গোস্বামীর পরামর্শে নতুন পথ
১৩ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে রিচা (Richa Ghosh) এলেন ক্রিকেটের মক্কা কলকাতায়, অনূর্ধ্ব-১৬ দলের ট্রায়ালে। প্রথমবার সুযোগ হয়নি। হতাশা গ্রাস করতে পারত, কিন্তু ঠিক তখনই তাঁকে পথ দেখালেন ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি ঝুলন গোস্বামী। তিনি একটাই পরামর্শ দিলেন — “হতাশ হয়ো না, আরও পরিশ্রম করো। তোমার মধ্যে প্রতিভা আছে।” এই সামান্য কথাতেই যেন নতুন করে অক্সিজেন পেল রিচার স্বপ্ন।
ঝুলনের সেই পরামর্শ রিচাকে আরও কঠিন পরিশ্রমী করে তুলল। তারপর একদিন এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ফের ট্রায়ালে ডাক। শুরু হলো রিচার সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা। অনূর্ধ্ব-১৬ বাংলা দল থেকে ভারতীয় দলে জায়গা, তারপর একের পর এক রেকর্ড। এই যাত্রায় ছায়ার মতো পাশে ছিলেন মহিলা দলের কোচ, প্রাক্তন পেসার শিবশঙ্কর পাল। কোচবিহারের এই প্রাক্তন ক্রিকেটার উত্তরবঙ্গের মাটি থেকে উঠে আসার লড়াইটা খুব ভালো করেই জানতেন। তাঁর কথায়, “আমার কোচিং ক্যাম্পে এত পরিশ্রমী আর প্রতিভাবান ক্রিকেটার আর পাইনি।”

আজ সেই একরোখা, বাউন্ডুলে মেয়েটিই গোটা দেশের ভরসা। কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী আজ তাকিয়ে আছে তাঁর ব্যাটের দিকে। রিচা ঘোষ (Richa Ghosh) শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি এক প্রতীক— উত্তরবঙ্গের মাটি থেকে উঠে আসা লড়াকু মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। তাঁর হাতে ব্যাট মানেই এক নতুন স্বপ্নের সূচনা, যা বাংলার প্রতিটি উঠতি মেয়ের মনে গেঁথে দিয়েছে সেই বিশ্বাস — ‘আমি পারব, আমিও রিচা হতে পারি।’


