Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিম বর্ধমান জেলার শিল্পাঞ্চল কুলটি-বরাকর অঞ্চলের ব্যস্ততার মাঝেই ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বেগুনিয়া সিদ্ধেশ্বরী দেউল মন্দির (Shivratri)। বরাকর-এর এই প্রাচীন স্থাপত্য কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি বাংলার মধ্যযুগীয় শিল্পরীতির এক মূল্যবান নিদর্শন। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও মন্দির প্রাঙ্গণে শিবভক্তদের ভিড় প্রমাণ করে ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের বন্ধন কখনও ম্লান হয় না।

পঞ্চদশ শতকের নির্মাণকথা (Shivratri)
প্রচলিত সূত্র অনুযায়ী, ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রাজা হরিশচন্দ্রের স্ত্রী হরিপ্রিয়া তাঁদের ইষ্টদেব শিবের উদ্দেশে এই মন্দির নির্মাণ করেন। যদিও এই তথ্যের সবটুকু লিখিত প্রমাণে সুসংহত নয়, তবুও স্থানীয় ঐতিহ্যে তা গভীরভাবে প্রোথিত। ব্রিটিশ আমলে পুরাতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে যুক্ত মার্কিন প্রকৌশলী জোসেফ ডেভিড বেগলার তাঁর গ্রন্থ বাংলা প্রদেশগুলির মধ্য দিয়ে ভ্রমণের প্রতিবেদন -এ বরাকরের এই মন্দিরগুলির বিশদ বিবরণ দেন। তাঁর বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, উনবিংশ শতকেই এই দেউলগুলির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকে কেন্দ্রীয় হেরিটেজ দপ্তর মন্দিরগুলিকে সংরক্ষণের আওতায় আনে এবং ১৯৫৪ সালে চারদিক ঘিরে সুরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ শুরু হয়।
‘বেগুনিয়া’ নামের উৎপত্তি (Shivratri)
এই মন্দিরসমূহ চারটি পাথরের দেউল আকারে নির্মিত। গঠনশৈলীতে স্পষ্ট ওডিশার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বিশেষত শিখর বা চূড়ার বিন্যাসে। বরাকরের বালি ও পাথর কেটে তৈরি এই মন্দিরগুলির উপরের অংশ অর্ধেক কাটা বেগুনের মতো আকৃতির হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এগুলি ‘বেগুনিয়া মন্দির’ নামে পরিচিত। যদিও এই নামের পেছনে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল নেই, তবুও লোকমুখে তা বহুল প্রচলিত। বর্তমান সেবাইত মধুসূদন দেওঘরিয়ার কথায়, চারটি মন্দিরের মধ্যে তিনটি পূর্বমুখী এবং একটি পশ্চিমমুখী। সিদ্ধেশ্বর শিবমন্দির ছাড়াও এখানে পার্বতী, কালী ও গণেশের পৃথক উপাসনাস্থল রয়েছে।

পাথরে খোদাই করা পৌরাণিক জগৎ (Shivratri)
মন্দিরগুলির গায়ে খোদাই করা অসাধারণ ভাস্কর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উড়ন্ত সিংহ, মকর, রাক্ষসাকৃতি মুখ, পৌরাণিক নকশা ও অলঙ্করণ সব মিলিয়ে এক সমৃদ্ধ শিল্পরীতি ফুটে উঠেছে। একাধিক শিবলিঙ্গের পাশাপাশি গণেশ, পার্বতী, দুর্গা প্রভৃতি দেবমূর্তির উপস্থিতি এই মন্দিরের ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে চিহ্নিত করে। কিছু স্থানে জৈন তীর্থঙ্কর সদৃশ মূর্তি ও বিষ্ণুমূর্তির উপস্থিতি থেকে অনুমান করা হয়, অতীতে এটি হয়তো জৈন উপাসনালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। তৃতীয় মন্দিরে খোদাই করা পাথরের মাছের প্রতীককে স্থানীয়রা নারীশক্তির চিহ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
আঞ্চলিক মিলনমেলা (Shivratri)
মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে বরাকরের এই প্রাচীন দেউল প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে ভক্তদের মিলনক্ষেত্র। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পার্শ্ববর্তী ধানবাদ, চিরকুন্ডা, কুমারডুবি প্রভৃতি ঝাড়খণ্ডের অঞ্চল থেকেও ভক্তরা আসেন। ভোর থেকেই শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টার শব্দ এবং ‘বোল বাম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির চত্বর। ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিও সক্রিয় থাকে। শিবরাত্রির পরদিনও দর্শনার্থীদের ভিড় অব্যাহত থাকে, যা এই মন্দিরের আঞ্চলিক প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে।

আরও পড়ুন: Uttar Pradesh: চলন্ত গাড়ির উপর হাইমাস্ট পোল! প্রতাপগড়ে চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনা!
ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াস
দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মন্দিরের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অবশেষে কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ প্রায় দেড় বছর আগে সংস্কারকাজ শুরু করে। বর্তমানে সংস্কারের কাজ চললেও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কোনও বিঘ্ন ঘটেনি এটি প্রশাসনের সচেতন পরিকল্পনার ফল। এই দেউলগুলির সংরক্ষণ কেবল ধর্মীয় নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে পাথরের তৈরি দেউল মন্দিরের সংখ্যা খুবই কম। সেই তুলনায় বরাকরের বেগুনিয়া সিদ্ধেশ্বরী মন্দির বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।



