Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায় রয়েছে (Firingi Kalibari), যেখানে একজন বিদেশি খ্রিস্টান সাহেবের নামেই গড়ে উঠেছে এক প্রসিদ্ধ কালীমন্দির। তিনি ভারতীয় ছিলেন না, হিন্দুও নন, তবু তাঁর ভক্তি ও ভালোবাসা আজও জড়িয়ে আছে “ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি” নামের সঙ্গে। এই মন্দির আজও মধ্য কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পূজাস্থান হিসেবে স্বীকৃত।

কালী কলকেত্তায়ালি (Firingi Kalibari)
প্রবাদ আছে “কালী কলকেত্তায়ালি”। অর্থাৎ, কলকাতা শহরের সঙ্গে দেবী কালিকার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। বারাণসী যেমন শিবের তীর্থ, তেমনই কলকাতা কালীমায়ের শহর। শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য কালীমন্দির তাদের মধ্যে অন্যতম বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি, যার অবস্থান বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট ও সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের সংযোগস্থলে।
মন্দিরের প্রতিষ্ঠা: শ্মশান থেকে শুরু (Firingi Kalibari)
মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ঘুরে ফিরে আসে শ্রীমন্ত ডোম নামে এক ভক্তের কাছে। কথিত আছে, তিনি একবার স্মলপক্স থেকে সেরে উঠে দেবীর অনুপ্রেরণায় গড়ে তোলেন একটি কালীমন্দির। সেই সময় ভাগীরথী নদী কাছ দিয়ে বইত, চারপাশ ছিল জঙ্গল ও শ্মশান। সেই মহাশ্মশানের ধারে একটি চালাঘরে প্রতিষ্ঠিত হয় সিদ্ধেশ্বরী কালীমূর্তি, সঙ্গে ছিল একটি শিবলিঙ্গও।

সাহেব যিনি কালীভক্ত! (Firingi Kalibari)
সেই সময় কলকাতায় পা রাখেন বহু ইউরোপীয় যুবক, তাদের মধ্যে অন্যতম অ্যান্টনি হেন্সম্যান, যিনি ইতিহাসে পরিচিত অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি নামে। কবিগানের জগতে এক অসাধারণ নাম এই অ্যান্টনি। সাহেব হয়েও তিনি ছিলেন প্রবল কালীভক্ত। নিয়মিত আসতেন শ্রীমন্তের মন্দিরে, বসে বসে গাইতেন মাতৃসঙ্গীত। লোককথায় বলা হয়, দেবী কালী স্বপ্নে দেখা দিয়ে অ্যান্টনিকে মন্দির সংস্কারের নির্দেশ দেন। সেই থেকেই তিনি মন্দিরের সংস্কার করেন ও দেন নতুন রূপ। এরপর থেকেই এই স্থান পরিচিতি পায় ‘ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি’ নামে। শুধু অ্যান্টনি নন, বহু পর্তুগিজ সাহেব ও ইংরেজ ব্যবসায়ী নিয়মিত পুজো দিতেন এই মন্দিরে।
সাহেবদের পুজো, বাঙালির বিশ্বাস (Firingi Kalibari)
ঔপনিবেশিক কলকাতায় এই মন্দির এক অনন্য উদাহরণ ছিল ধর্মীয় সহাবস্থানের। বলা হয়, অনেক বিদেশি ব্যবসায়ী ফিরিঙ্গি মায়ের পুজো দিয়ে ব্যবসায় সাফল্য লাভ করতেন। দেবীর নাম মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল শহর জুড়ে। পরবর্তীকালে অ্যান্টনি তাঁর আরাধ্য দেবীকে ডাকতেন ‘শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা ঠাকুরানি’ নামে।

মন্দিরের স্থাপত্য ও বিশেষত্ব (Firingi Kalibari)
ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি একটি দক্ষিণমুখী মন্দির, নির্মাণশৈলীতে চাঁদনি ঘর ধাঁচের। মাতৃমূর্তি সাধারণ কালীপ্রতিমার মতো হলেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
- দেবীর দক্ষিণে অষ্টধাতুর দুর্গা মূর্তি
- একটি শিবলিঙ্গ
- পাশাপাশি শীতলা ও মনসার মূর্তি
এছাড়া মাসে দু’বার অন্নভোগ ও প্রতিদিন ফল-মিষ্টি নিবেদন করা হয়। অমাবস্যাতে বিশেষ পুজো হয়, আর কার্তিক অমাবস্যাতেই পালিত হয় বার্ষিক কালীপূজা।

অ্যান্টনি ও প্রমীলাদেবীর প্রেম (Firingi Kalibari)
মন্দিরের ইতিহাসে এক রোমান্টিক অধ্যায়ও আছে। চন্দননগরের বাসিন্দা অ্যান্টনি যখন কলকাতায় আসতেন, তখন মন্দিরের দেখাশোনা করতেন এক বিধবা প্রমীলাদেবী। তাঁদের মধ্যে জন্ম নেয় গভীর প্রণয়। এই প্রেমকাহিনি পরবর্তীকালে বাঙালির মন জয় করে সিনেমার পর্দায় একদিকে উত্তম কুমারের ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, অন্যদিকে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতিস্মর’।
ইতিহাসবিদদের ভিন্ন মতামত (Firingi Kalibari)
তবে ইতিহাসবিদ রাধারমণ মিত্র তাঁর গ্রন্থ ‘কলকাতা দর্পণ’-এ দাবি করেন, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির সঙ্গে এই মন্দিরের কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই। এটি নাকি লোকগাথার অংশ, ঐতিহাসিক প্রমাণ নয়। তবুও আজও বাঙালির বিশ্বাস ও ভক্তিতে অ্যান্টনিই ফিরিঙ্গি কালীমন্দিরের প্রণেতা।
কোথায় অবস্থিত (Firingi Kalibari)
ঠিকানা: ২৪৪, বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০১২ এই অঞ্চল এককালে গঙ্গার ধারে ঘন অরণ্য ছিল। মন্দিরের ফলকে প্রতিষ্ঠার সাল লেখা রয়েছে ৯০৫ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ শহর কলকাতার আনুষ্ঠানিক জন্মেরও আগে।
আরও পড়ুন: Rashmika-Vijay Deverakonda: রশ্মিকার হাতে জ্বলজ্বলে হিরের আংটি, বাগদানে সিলমোহর?

বর্তমানের পূজা ও তার নিয়ম
বর্তমানে মন্দিরটি ব্যানার্জি পরিবারের ছয় শরিকের অধীনে। প্রতিদিন নিয়মমাফিক বৈদিক মতে পূজা হয়। একদা পশুবলি প্রচলিত থাকলেও এখন তা সম্পূর্ণ বন্ধ। প্রতিমাসে দুইবার অন্নভোগ, অমাবস্যায় বিশেষ পূজা, আর কার্তিক অমাবস্যায় উৎসবমুখর কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। সেবাইত অঙ্কেশ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, পূজা হয় সম্পূর্ণ বৈদিক পদ্ধতিতে। কোভিড পরবর্তী সময়ে ভক্তদের জন্য রয়েছে কঠোর নিয়ম একসঙ্গে ৫ থেকে ৮ জনের বেশি প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না, মাস্ক ও স্যানিটাইজার বাধ্যতামূলক।



