Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শ্রীকৃষ্ণ এই নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শ্যামবর্ণ এক কিশোর, ঠোঁটে মধুর হাসি আর হাতে তাঁর চিরসঙ্গী বাঁশি (Sri Krishna)। কৃষ্ণ ও বাঁশি যেন একে অপরের পরিপূরক। ঠিক যেমন শরীরের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক, তেমনই কৃষ্ণের সঙ্গে বাঁশির সম্পর্ক। এই বাঁশি শুধুমাত্র একটি বাদ্যযন্ত্র নয় এটি প্রেম, ভক্তি, আত্মসমর্পণ এবং পরম সত্যের প্রতীক। কৃষ্ণের বাঁশির সুরে মুগ্ধ হতো গোপীগণ, থমকে যেত যমুনার প্রবাহ, নত হতো বৃক্ষলতা, এমনকি দেবতাদের মনেও জেগে উঠত অপার্থিব এক অনুভূতি। কিন্তু দ্বাপর যুগের শেষে, যখন শ্রীকৃষ্ণ মর্ত্যলোক ত্যাগ করেন, তখন প্রশ্ন জাগে কী হয়েছিল তাঁর সেই অলৌকিক বাঁশিটির? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় পুরাণ, মহাভারত ও লোকবিশ্বাসের পথে।

দৈব বাঁশির জন্মকথা (Sri Krishna)
পুরাণ মতে, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিটি ছিল কোনও সাধারণ বাঁশ দিয়ে তৈরি নয়। বিশ্বাস করা হয়, স্বয়ং মহাদেব এই বাঁশি উপহার দিয়েছিলেন কৃষ্ণকে। যখন শিব গোকূলে গিয়ে নন্দগোপের গৃহে শিশু কৃষ্ণকে দর্শন করেন, তখন তিনি এই দৈব বাঁশিটি তাঁকে প্রদান করেন। আরও বলা হয়, ঋষি দধিচির অস্থি দিয়ে এই বাঁশি নির্মিত হয়েছিল। যেমন বজ্রায়ুধ তৈরি হয়েছিল দধিচির আত্মবলিদান থেকে, তেমনই এই বাঁশিও আত্মত্যাগ ও ত্যাগের প্রতীক। এই বাঁশির সুর আত্মা ও শরীরের মধ্যে এক অলৌকিক সংযোগ স্থাপন করত। তাই কৃষ্ণের বাঁশি বাজলেই শুধু মানুষ নয় প্রকৃতি, পশুপাখি, দেবতা সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেত।

অমর প্রেমের সাক্ষ্য (Sri Krishna)
শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি মূলত রাধাকৃষ্ণের অমর প্রেমের প্রতীক বলেই বিবেচিত। বৃন্দাবনের লীলায় এই বাঁশিই ছিল রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের অব্যক্ত কথোপকথনের মাধ্যম। কথিত আছে, রাধার নাম উচ্চারণ না করেও কৃষ্ণ তাঁর বাঁশির সুরে রাধাকেই ডাকতেন। প্রচলিত এক কাহিনি অনুসারে, দ্বারকায় রাধার শেষ সময়ে কৃষ্ণ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করতে জীবনের সবচেয়ে মধুর সুরটি বাঁশিতে বাজান। সেই সুর শুনেই রাধা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রিয়তমাকে হারিয়ে কৃষ্ণ গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। তাঁর কাছে মনে হয়, রাধা না থাকলে বাঁশির আর কোনও অর্থ নেই। সেই অসীম বেদনা থেকেই কৃষ্ণ তাঁর প্রিয় বাঁশিটি ভেঙে জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলে দেন। এরপর আর কোনওদিন তিনি কোনও বাদ্যযন্ত্র স্পর্শ করেননি।
যদুবংশের ধ্বংস ও সমুদ্রে বিলীন বাঁশি (Sri Krishna)
অন্য একটি বিশ্বাস অনুযায়ী, কৃষ্ণের বাঁশি ছিল তাঁর দৈব শক্তির বহিঃপ্রকাশ। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর যদুবংশের অন্তর্দ্বন্দ্বে যখন সম্পূর্ণ বংশ ধ্বংস হয়ে যায়, তখন কৃষ্ণ বুঝে যান তাঁর লীলা সমাপ্তির সময় এসে গেছে। এরপর এক ব্যাধের তীরবিদ্ধ হয়ে তিনি দেহত্যাগ করেন। সেই সময়ই সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক ভয়ংকর ঢেউয়ে দ্বারকা নগরী সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যায়। বিশ্বাস করা হয়, সেই মহাপ্রলয়ের মধ্যেই শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি চিরকালের মতো সমুদ্রে হারিয়ে যায়। মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় সেই দৈব বাদ্যযন্ত্র।
আরও পড়ুন: H5N1 Outbreak: শতাধিক কাকের মৃত্যু, পরীক্ষায় ধরা পড়ল H5N1 ভাইরাস
বৃক্ষরূপে বাঁশির পুনর্জন্ম
ব্রজভূমিতে প্রচলিত আরেকটি লোকবিশ্বাস এই রহস্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। সেখানে বলা হয়, কৃষ্ণ মর্ত্যলোক ত্যাগের আগে যমুনার তীরে তাঁর প্রিয় বাঁশিটি রেখে যান। কালক্রমে সেই বাঁশি থেকেই জন্ম নেয় এক বিশেষ বৃক্ষ যাকে বলা হয় বংশী বট বা বংশী বৃক্ষ। আজও বৃন্দাবন ও ব্রজ অঞ্চলে কয়েকটি প্রাচীন গাছকে এই নামে পূজা করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই গাছগুলির মধ্যেই আজও কৃষ্ণের বাঁশির সুর লুকিয়ে আছে। বাতাস বইলে পাতার মর্মরে যেন শোনা যায় সেই চিরপরিচিত মধুর ধ্বনি।



