Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কোনো বই পড়া মানে সত্যিই সেই লেখকের মাথার ভিতর আংশিক প্রবেশ করা (Trayan Chakraborty)। “শুরুর শুরু” পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা যেন নির্বাণের মনের করিডোরে হাঁটছি। শব্দের পিঠে শব্দ বসিয়ে এয়ণ চক্রবর্তী এমন এক অন্তর্লোক নির্মাণ করেছেন, যেখানে মনখারাপ আত্মকথা হয়ে ওঠে, আর আত্মকথা সমাজ-সময়ের দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ভূমিকায় চন্দন সেন যে কথা ইঙ্গিত করেন, এই বই নিছক ব্যক্তিগত আখ্যান নয়, এটি এক প্রজন্মের মানসিক অবসাদ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিরোধের নথি।

মনখারাপের জ্যামিতি (Trayan Chakraborty)
নির্বাণের জন্ম শহুরে ক্লান্তির ভিতর। অফিস ফেরতা হাঁটা, পকেটের টাকার খেয়াল, চলন্ত অটো থেকে “ভাইসাব আপকি ওয়ালেট” এই ছোট ছোট মুহূর্তে গড়ে ওঠে চরিত্রের বাস্তবতা। নির্বাণ কবিতা লিখতে পারছে না, এই অক্ষমতাই তার ট্র্যাজেডি। তার মনখারাপ ব্যক্তিগত হলেও, তা আমাদের সবার। যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সেই চিরকালীন আকুলতা, “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।” নির্বাণও অপেক্ষা করে, নিজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে বলে।
দিনের শেষে নির্বাণ (Trayan Chakraborty)
কলকাতা এই বইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। পার্কের ঘাস, লেকের জল, ফুচকার ভাগ এই শহর প্রেম শেখায়, আবার নির্মমতাও শেখায়। ট্রামের প্রসঙ্গ এসে মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশ-এর মর্মান্তিক পরিণতি। শহর যেমন আশ্রয় দেয়, তেমনই গ্রাসও করে। নির্বাণের ক্লান্তি শহুরে মানুষের ক্লান্তি। এই ক্লান্তি সত্ত্বেও সে ভালোবাসার গন্ধ নেয়, বিড়ি ধরায়, স্মৃতি রোমন্থন করে এ যেন এক প্রতিবাদ, এক বেঁচে থাকার অনুশীলন।
গান ও কবিতার ভেতর নির্বাণ (Trayan Chakraborty)
এই গ্রন্থে সুর ও কবিতার গভীর উপস্থিতি রয়েছে। সলিল চৌধুরী-র বিপ্লবী সুর সমাজসচেতনতার দিকটি উন্মোচন করে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-এর কণ্ঠে যে বিষণ্ণতা, তা নির্বাণের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। অঞ্জন দত্ত-র শহুরে একাকিত্ব নির্বাণের ভেতরকার কথোপকথনের মতোই। কবিতার ক্ষেত্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর প্রেমময় বিদ্রোহ, শঙ্খ ঘোষ-এর মিতবাক বেদনা, সবই এই বইয়ের অন্তর্লীন স্রোতে মিশে গেছে।

পুজোর চিঠি (Trayan Chakraborty)
পুজো এখানে কেবল উৎসব নয়; এটি স্মৃতির পুনরাগমন। শ্রীপঞ্চমীর চিঠি কিংবা পুজোর চিঠিতে নির্বাণ যেন অতীতের কাছে ফিরে যায়। পুজোর আলোয় সে নিজের অন্ধকার চিনতে শেখে। এই আত্মস্বীকৃতি বইটির অন্যতম শক্তি। ‘খাঁকি ও নির্বাণ’ কিংবা ‘ভোটাধিকার, ২০১৯’ অধ্যায়ে ব্যক্তিগত বয়ান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিস্তৃত হয়েছে। ক্ষমতার চাবুক, প্রশাসনিক নিষ্ঠুরতা, সবকিছুর মধ্যে নির্বাণ প্রশ্ন তোলে। এখানে লেখক ব্যক্তিগত বিষণ্ণতাকে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে গ্রন্থটি কেবল আত্মকথা নয়, সমকালীন সময়ের দলিল হয়ে উঠেছে।
ক্ষুধা, মুক্তি ও আত্মবোধ (Trayan Chakraborty)
“গরম ভাত” কবিতায় দৈনন্দিন জীবনের সরল প্রয়োজন উঠে এসেছে। “দুঃখের নীলকণ্ঠ” যন্ত্রণা ধারণের শক্তির প্রতীক।
“বুড়ো নয়, বড় হচ্ছি” কবিতায় পরিণতির বোধ স্পষ্ট। এই কবিতাগুলো গদ্যের পরিপূরক, আবার স্বতন্ত্রও।

আরও পড়ুন: Suniti Kumar Chatterjee: মহাগ্রন্থের শতবর্ষ! ‘ও-ডি-বি-এল’এই বই বাঙালির আত্মপরিচয়ের শিকড়
নির্বাণ আমাদেরই একজন!
“শুরুর শুরু” এ এক অবিরাম আরম্ভের দিগন্ত। নির্বাণের মনখারাপ, তার হেঁটে চলা, তার কবিতা না-পারা, তার পকেটের টাকার দিকে ফিরে তাকানো সব মিলিয়ে এ যেন আমাদেরই দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি। আমরা যারা শহরের ভিড়ে হারিয়ে যাই, ট্রামের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি, পুজোর ভিড়ে পুরোনো মুখ খুঁজি নির্বাণ আমাদেরই একজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন অন্ধকারের ভিতর দিয়েই আলোকে চিনতে হয়, তেমনই নির্বাণের যন্ত্রণার ভিতর দিয়েই তার লেখার জন্ম। এয়ণ চক্রবর্তী দেখিয়েছেন ব্যক্তিগত বেদনা কখনো কখনো সামাজিক দলিলে পরিণত হয়। শহরের ধুলো, রাজনীতির চাবুক, ভালোবাসার অনিশ্চয়তা সব কিছুর মাঝেও শব্দই শেষ আশ্রয়। কবিতাই শেষ অবলম্বন। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই শেষ ট্রেনটা মিস করেছি? নাকি এখনও সময় আছে, নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার?



