Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের ধারায় এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছিলেন তিন সাহিত্যিক নক্ষত্র তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ত্রয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরন্তন সংযোজন (Bibhutibhushan Bandyopadhyay)। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পর যে নতুন প্রাণশক্তি বাংলা কথাসাহিত্যে প্রবাহিত হয়েছিল, তার মূল উৎস এই ত্রয়ীর সৃষ্টিশক্তি।

প্রকৃতির মাঝে নিজের সন্ধান (Bibhutibhushan Bandyopadhyay)
বিভূতিভূষণ তাঁর সাহিত্যে প্রকৃতি ও মানুষকে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বেঁধেছেন। তাঁর রচনায় মানবজীবনের অন্তর্লীন বেদনা যেমন ধরা পড়েছে, তেমনি প্রকৃতিও সেখানে জীবন্ত সত্তা হয়ে ওঠে। তারাশঙ্করের লেখায় যেমন রাঢ় বাংলার জনজীবনের সরল অথচ গভীর রূপ ফুটে ওঠে, আর মানিকের কলমে বিজ্ঞানমনস্কতা ও মার্ক্সবাদী চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়, তেমনি বিভূতিভূষণের সৃষ্টিতে আমরা পাই এক আত্মার স্পর্শ যেখানে জীবনের ক্ষুদ্রতম মুহূর্তও মহিমামণ্ডিত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্র সূর্য যখন সায়াহ্নের দিকে গমন করছেন, তখন বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে নক্ষত্র উজ্জ্বল দীপ্তিতে উদিত হন, তিনি হলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
অভাব থেকে অলৌকিক উত্তরণ (Bibhutibhushan Bandyopadhyay)
লেখালেখি করবেন, লেখক হবেন এই স্বপ্ন তাঁর জীবনে কখনও ছিল না। অভাব-অনটনে ভরা শৈশব, অর্থকষ্টে জর্জরিত যৌবন সবকিছুকে পেরিয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর সাহিত্যজীবন। ১৯১৮ সালে রিপন কলেজ থেকে ডিস্টিংশন নিয়ে বিএ পাশ করেন তিনি। জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেন হুগলির জাঙ্গিপাড়ার এক মাইনর স্কুলে, পরে সোনারপুরের হরিনাভিতে। এই হরিনাভিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এখানেই পরিচয় হয় তরুণ সহকর্মী পাঁচুগোপালের সঙ্গে, যিনি একদিন রসিকতা করে দেয়ালজুড়ে ঘোষণা সাঁটিয়ে দেন “বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন উপন্যাস শীঘ্রই প্রকাশিত হবে!” বিভূতিভূষণ অবাক ও অপ্রস্তুত কারণ তিনি তো কিছুই লেখেননি! কিন্তু সেই ঘটনার চাপেই জন্ম নেয় এক অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালী’।

পথের পাঁচালী: জীবনের পাঁচালী (Bibhutibhushan Bandyopadhyay)
‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে ‘পথের পাঁচালী’। কয়েকটি কিস্তি বেরোতেই বাংলা পাঠকজগৎ আলোড়িত হয়ে ওঠে। নিসর্গ ও মানবজীবনের এমন অন্তর্মিলন, এমন কোমল অথচ তীব্র জীবনচিত্র বাংলা সাহিত্য আগে দেখেনি। অপুর চোখে দেখা গ্রামের দুঃখ, দারিদ্র্য, স্বপ্ন আর আনন্দ সবই ধরা পড়েছে এমনভাবে, যেন প্রতিটি পৃষ্ঠা প্রকৃতির হৃদস্পন্দনে আন্দোলিত।
আরও পড়ুন: West Midnapore Patchitra: একটা গোটা গ্রামই যদি হয় ক্যানভাস! তবে শিল্প কখনও থামে?
বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা কে?
‘পথের পাঁচালী’-র মধ্য দিয়েই বাংলা উপন্যাস এক নতুন দিগন্তে পৌঁছেছিল। বিভূতিভূষণ প্রমাণ করেছিলেন সাহিত্য কেবল ভাষার শৈলী নয়, এটি জীবনের দর্শন। প্রকৃতি তাঁর লেখায় শুধু পটভূমি নয়, বরং জীবনেরই প্রতিরূপ। অপুর মতোই তিনি বিশ্বাস করতেন, “জীবন মানেই চলা অবিরাম পথচলা।” আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল এক সাহিত্যিককে নয়, এক মানবতাবাদী চিন্তককে শ্রদ্ধা জানানো যিনি দেখিয়েছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ জীবনই হতে পারে সবচেয়ে অসাধারণ কাব্য।



