Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: উত্তরপ্রদেশের বলরামপুরে গভীর রাতে ঘটে গেল এমন এক দুর্ঘটনা, যা আবারও প্রশ্ন তুলল ভারতীয় সড়ক নিরাপত্তার বাস্তবতা নিয়ে (Bus Accident)। যাত্রিবাহী বাস ও মালবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষের জেরে মুহূর্তে আগুন ধরে যায় বাসে। ঝলসে মৃত্যু হয় তিন যাত্রীর, আহত হন অন্তত পঁচিশ জন। আতঙ্ক, অগ্নিকুণ্ড আর মৃত্যুচিৎকারে থমকে যায় ফুলওয়ারিয়া বাইপাস। এই ঘটনা কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনার বিবরণ নয়; বরং প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াতের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

মৃত্যুর দিকে ছুটে চলা দুটি যান (Bus Accident)
সোমবার গভীর রাতে বিহারের সোনাউলি থেকে দিল্লিগামী এক যাত্রীবোঝাই বাস দ্রুতগতিতে এগোচ্ছিল ফুলওয়ারিয়া বাইপাস ধরে। একই সময় বিপরীত দিক থেকে শীতের জামাকাপড় বোঝাই একটি ভারী ট্রাক ওভারব্রিজ থেকে নেমে আসছিল। রাতের অন্ধকার, কুয়াশার সম্ভাবনা এবং রাস্তার অনিশ্চিত পরিবেশ সব মিলিয়ে সামনে কী অপেক্ষা করছে, তার কোনও পূর্বাভাস ছিল না চালকদের। ওভারব্রিজ থেকে নামার পরই ট্রাকটি সজোরে ধাক্কা মারে বাসটিকে। সংঘর্ষ এতটাই তীব্র ছিল যে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে গিয়ে সরাসরি ধাক্কা মারে একটি হাই ভোল্টেজ বিদ্যুতের খুঁটিতে। মুহূর্তেই শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন লেগে যায় বাসে।
একটি সাধারণ যাত্রাপথ মুহূর্তে রূপ নেয় ভয়াবহ মৃত্যুকূপে।

বাসের ভেতরে বন্দি আতঙ্ক (Bus Accident)
ধাক্কার শব্দের পরেই ছড়িয়ে পড়া আগুন বাসটিকে মুহূর্তে অগ্নিগোলকে পরিণত করে। যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন। পথঘাট ফাঁকা থাকায় প্রথম কয়েক মিনিট কেউই বুঝতে পারেনি ঠিক কী ঘটেছে। বাসের জানালা ভেঙে অনেকেই প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুনের তাপ, ধোঁয়ার দমবন্ধ ভাব এবং বাসের ভেতর আটকে যাওয়া যাত্রীদের আর্তনাদ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ঘটনাস্থলেই তিনজন যাত্রী ঝলসে মারা যান, ২৫ জনের মতো গুরুতর আহত, বহু যাত্রী আগুনের শিখায় হাত-পা, মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশে দগ্ধ হন, দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ট্রাকেও আগুন ধরে যায়, যা উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তোলে।
রাতের অন্ধকারে উদ্ধার অভিযান (Bus Accident)
দমকল কর্মীরা খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে যান ঘটনাস্থলে। পুলিশও পৌঁছে যায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখা প্রথমদিকে নেভানো ছিল প্রায় অসম্ভব। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন কিছুক্ষণ পরে নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর শুরু হয় আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারের কাজ। স্থানীয়রা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের বের করে আনতে সাহায্য করেন। আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ছ’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত স্থানান্তর করা হয় বাহরাইচ মেডিক্যাল কলেজে। ঘটনাস্থলে ছুটে যান বলরামপুরের জেলাশাসক বিপিন কুমার এবং পুলিশ সুপার বিকাশ কুমার। তাঁরা আহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

দায় এড়ানোর চেষ্টা? (Bus Accident)
দুর্ঘটনার পরই, বাসের চালক, কন্ডাক্টর, এবং ট্রাকের চালক, তিনজনেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এতে আরও রহস্য তৈরি হয়েছে। পুলিশ তদন্তে জানিয়েছে, অতিরিক্ত গতি কিংবা কুয়াশা এই দুইয়ের যেকোনও একটি দুর্ঘটনার মূল কারণ হতে পারে। তবে চালকদের পালিয়ে যাওয়া আরও সন্দেহজনক। মদ্যপ চালানো, ফিটনেসহীন যানবাহন, কিংবা ব্রেকফেল যে কোনও কারণ থাকতে পারে, যা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।

র্মান্তিক মৃত্যু (Bus Accident)
বাসটির অধিকাংশ যাত্রীই নেপালের বাসিন্দা ছিলেন। নিজেদের দেশে পরিবার-পরিজনকে রেখে কাজ বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তারা দিল্লির পথে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের যাত্রাপথ শেষ হয়ে গেল অগ্নিপুঞ্জে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মৃত্যু প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্ব বহন করে। নেপাল সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: Jaishankar : জীবাণু অস্ত্রের অপব্যবহার আশঙ্কা অযৌক্তিক নয়: সতর্কতা জয়শঙ্করের
নিরাপত্তাহীনতা কতদিন?
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রতি পরপর বাসদুর্ঘটনায় আগুন লাগার ঘটনা বেড়েই চলেছে। রাজস্থানের জয়সালমীর ও বারমেরের ভয়াবহ দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বলরামপুর। কেন বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটছে? অতিরিক্ত গতি, চালকদের ক্লান্তি, লম্বা যাত্রাপথে নজরদারি নেই, ট্রাক–বাস মালিকদের ফিটনেস নিয়ে উদাসীনতা, রাস্তার অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা, কুয়াশা বা কম দৃশ্যমানতার সময় সতর্কতা না নেওয়া, এই ধারাবাহিক মৃত্যুমিছিল আমাদের ভাবিয়ে তোলে। প্রতিদিন এত প্রাণহানি হচ্ছে, অথচ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তেমন কোনও দৃশ্যমান উন্নতি নেই।



