Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: যুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে ধ্বংস, মৃত্যু এবং অমানবিকতার প্রতীক হয়ে (White Phosphorus)। প্রতিটি যুদ্ধই কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘর্ষ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সাধারণ মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ। তাই যুদ্ধ মানেই একদিকে শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে মানবিকতার অপমৃত্যু। সাম্প্রতিক ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। এই সংঘাতে লেবাননের বেসামরিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

লেবাননে সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ (White Phosphorus)
মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলির দাবি অনুযায়ী, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ইয়োমোরে শহরে বসতিপূর্ণ এলাকায় কামানের গোলা থেকে সাদা ফসফরাস নিক্ষেপ করেছে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী। সাতটি উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে এই অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থার গবেষক রামজি কাইস জানান, আবাসিক এলাকায় এই ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এর ফলে কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, সাধারণ মানুষও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ঘরবাড়ি, গাড়ি এবং স্থানীয় অবকাঠামোর উপর এই গোলা পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
সাদা ফসফরাস কী? (White Phosphorus)
সাদা ফসফরাস একটি অত্যন্ত সক্রিয় রাসায়নিক পদার্থ। এটি সাধারণত কামানের গোলা, বোমা বা রকেটের মধ্যে ব্যবহার করা হয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলেই এটি দ্রুত জ্বলে ওঠে এবং তীব্র তাপ উৎপন্ন করে। সামরিক ক্ষেত্রে সাদা ফসফরাস মূলত তিনটি কাজে ব্যবহার করা হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে ধোঁয়ার আচ্ছাদন তৈরি করতে, লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে, আগুন লাগানোর অস্ত্র হিসেবে, তবে বাস্তবে এটি অনেক সময়ই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি করে এবং আশেপাশের সবকিছু পুড়িয়ে দেয়।
কতটা ভয়ংকর এই রাসায়নিক অস্ত্র (White Phosphorus)
সাদা ফসফরাসের ভয়াবহতা মূলত তার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। এটি মানুষের শরীরে পড়লে মাংস ভেদ করে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। তীব্র জ্বালায় শরীরের গভীর টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় শরীরে ঢুকে থাকা ফসফরাস অক্সিজেনের সংস্পর্শে আবার জ্বলে ওঠে, ফলে চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এর আরও কিছু মারাত্মক প্রভাব রয়েছে, ভয়াবহ দাহ ও ক্ষত: শরীরে লাগলে গভীর দগ্ধ ক্ষত তৈরি হয়, শ্বাসকষ্ট: এর ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, অগ্নিকাণ্ড: বাড়ি, বন বা কৃষিজমিতে পড়লে মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা: বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘমেয়াদি রোগ সৃষ্টি করতে পারে, এই কারণেই জনবহুল এলাকায় এই অস্ত্র ব্যবহারকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়।
আন্তর্জাতিক আইনে সাদা ফসফরাসের ব্যবহার (White Phosphorus)
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং যুদ্ধ সংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি অনুযায়ী, জনবহুল বা বেসামরিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহার করা অবৈধ। বিশেষ করে এমন অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না, যার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন এবং যা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে। তাই লেবাননে সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার (White Phosphorus)
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত উত্তপ্ত। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পর সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তেহরানসহ ইরানের একাধিক অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর সামনে এসেছে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি এবং ইজরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। কুয়েত, বাহরিন, ওমান, জর্ডন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সৌদি আরব, সিরিয়া এবং তুরস্কসহ বহু অঞ্চলে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। ইতিমধ্যেই ইরানে মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: Gyanesh Kumar: কালীঘাটে পুজো দিতে গিয়েই বিক্ষোভ! গো ব্যাক স্লোগানের মুখে জ্ঞানেশ কুমার
শান্তির আহ্বান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া, চিন, ভারতসহ বহু দেশ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল চাইছে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান হোক। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই যুদ্ধ থামানোর ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।



