Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শুভ চক্রবর্তী: টানা কয়েকদিনের অতি ভারী বৃষ্টিপাতের জেরে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক বন্যা পরিস্থিতি (Suvendu Adhikari)। একাধিক নিচু এলাকা জলের তলায় চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়েছে বন্যার জল, কোথাও আবার রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শুধু বসতবাড়িই নয়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমিও জলের তলায় চলে যাওয়ায় বড়সড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কৃষকদের মধ্যে।

এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সবংয়ের বন্যাকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আকাশপথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি। প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিক নির্দেশও দেন।
আকাশপথে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন (Suvendu Adhikari)
এদিন প্রথমে হেলিকপ্টারে করে সবংয়ের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী। জলমগ্ন গ্রাম, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, নদী এবং সংলগ্ন এলাকার পরিস্থিতি উপর থেকে খতিয়ে দেখেন তিনি।
এরপর সবংয়ের বাররামজীবনপুরে তৈরি অস্থায়ী হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে গাড়িতে করে সবং বিডিও অফিসের দিকে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে দুর্গত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি শোনেন জলবন্দি মানুষের সমস্যা, বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি, পানীয় জলের সংকট এবং খাদ্য সরবরাহের পরিস্থিতির কথা।
দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ (Suvendu Adhikari)
বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসনের তরফে ইতিমধ্যেই উদ্ধার ও ত্রাণকাজ শুরু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বহু মানুষকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের জন্য ত্রাণশিবিরে থাকা, খাবার এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিষেবা, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রীও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জলমগ্ন এলাকাগুলিতে প্রশাসনকে আরও বেশি নজরদারি চালানোর কথাও বলা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির জন্য ৩০ হাজার টাকা (Suvendu Adhikari)
সবং পরিদর্শন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বন্যার কারণে যেসব বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই পরিবারগুলিকে ৩০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা জানান তিনি।
প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দীর্ঘদিনের বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু পরিবার এখন কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এই আর্থিক সহায়তা তাঁদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বন্যায় মৃতদের পরিবারকে ৯ লক্ষ টাকা
বন্যাজনিত কারণে সবংয়ে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান মুখ্যমন্ত্রী। বন্যার কারণে মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে ৯ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের এই ঘোষণায় দুর্গত পরিবারগুলির পাশে প্রশাসনের থাকার বার্তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সাপের আতঙ্ক, আহত ১০ (Suvendu Adhikari)
বন্যার জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবংয়ের বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে সাপের উপদ্রব। জলমগ্ন বাড়িঘর ও চাষের জমিতে সাপের আতঙ্কে রয়েছেন বহু মানুষ। জানা গিয়েছে, সাপের কামড়ে ১০ জন আহত হয়েছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁরা সুস্থ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বন্যাকবলিত এলাকায় চিকিৎসক, ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জলের তলায় কৃষিজমি, চিন্তায় চাষিরা (Suvendu Adhikari)
সবংয়ের অর্থনীতির বড় অংশ কৃষিনির্ভর। কিন্তু বন্যার জলে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ডুবে যাওয়ায় ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি ফসল চোখের সামনে জলের তলায় চলে যাওয়ায় উদ্বেগে পড়েছেন কৃষকেরা। এই ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি ও ফসলের হিসাব সংগ্রহ করে কৃষকদের কৃষি বিমার আওতায় আনার ব্যবস্থা করার কথা জানানো হয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও পূরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মাদুর ও পান চাষেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা (Suvendu Adhikari)
সবংয়ের বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে মাদুর শিল্প ও পান চাষের সম্পর্ক রয়েছে। বন্যার জলে এই দুই ক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পানবরজে জল ঢুকে গেলে চাষিদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। মাদুর ও পান চাষিদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। তাঁদের জন্য পৃথকভাবে কী ধরনের আর্থিক বা সরকারি সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানানো হয়েছে।
উদ্ধারকাজে পুলিশের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
বন্যা পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত রয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন। জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছেন পুলিশকর্মীরাও। এই কাজ আরও দ্রুত ও সমন্বিতভাবে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জলমগ্ন এলাকায় কোথাও নতুন করে পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
বিডিও অফিসে প্রশাসনিক বৈঠক (Suvendu Adhikari)
সবং বিডিও অফিসে পৌঁছে প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে বন্যার সামগ্রিক পরিস্থিতি, জলস্তর, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব, ত্রাণশিবিরের অবস্থা, পানীয় জল, খাদ্য সরবরাহ এবং চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বন্যার জল পুরোপুরি না নামা পর্যন্ত প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির নিয়মিত পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে আরও মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখার কথাও বলা হয়েছে।
জল নামার অপেক্ষায় সবংবাসী (Suvendu Adhikari)
মুখ্যমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে এদিন সবংয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দুর্গত মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পাশাপাশি বাড়িঘর, কৃষিজমি, জীবিকা এবং বন্যাজনিত মৃত্যুর মতো একাধিক বিষয়ে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এখনও সবংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যার জল পুরোপুরি নামেনি। ফলে স্বস্তি ফেরার আগে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। আবহাওয়া ও জলস্তরের গতিবিধির উপর নজর রাখছে প্রশাসন। প্রয়োজনে আরও মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: Suvendu Adhikari: অগ্নিকাণ্ডের পর বড় প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রীর বার্তায় চাঞ্চল্য
সরকারের আর্থিক সহায়তার ঘোষণায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও কৃষকদের মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও, তাঁদের মূল দাবি এখন দ্রুত জল নামানো এবং স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনা। বাড়িঘর, কৃষিজমি ও জীবিকা হারানোর ধাক্কা সামলে সবং কবে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে দুর্গত মানুষ।



