Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সমাজের চোখে কিছু মানুষ একটু ‘অন্যরকম’। তাঁদের আচরণে অস্বস্তি, কথাবার্তায় বেপরোয়া ভাব, প্রশ্নে চমকে ওঠার মতো তীব্রতা (Social Commentary)। তাই খুব সহজেই তাঁদের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয় ‘পাগল’-এর তকমা। অথচ এই ‘ফাটল’-এর মধ্য দিয়েই অনেক সময় আলো ঢোকে। প্রচলিত চিন্তার বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁরা এমন কিছু প্রশ্ন করেন, যা নিশ্চিন্ত দৈনন্দিন জীবনে থাকা মানুষটি করতে সাহস পান না।

নিরাপদ ঘেরাটোপের বাইরে দাঁড়ানো মানুষ (Social Commentary)
আমরা সাধারণত এমন বাস্তবতাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, যার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার মধ্যেই যদি অন্যায়, বৈষম্য কিংবা ক্ষমতার দাপট লুকিয়ে থাকে? তখন প্রয়োজন হয় এমন কিছু মানুষের, যাঁরা সেই ঘেরাটোপ ভাঙতে পারেন। তাঁদের অস্বস্তিকর প্রশ্নই সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়।
‘পাগল’ তকমা কি অস্বস্তি এড়ানোর সহজ অস্ত্র?
কোনও যুক্তির উত্তর না থাকলে মানুষকে ‘পাগল’ বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। অজানাকে স্বীকার করার সাহস না থাকলে তাকে অস্বীকার করাই নিরাপদ পথ হয়ে ওঠে। ফলে ‘পাগল’ শব্দটি অনেক সময় মানসিক অবস্থার বর্ণনা না হয়ে সামাজিকভাবে কাউকে চুপ করিয়ে দেওয়ার অস্ত্রে পরিণত হয়।
ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলার সাহস (Social Commentary)
এই চরিত্রগুলির সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁদের প্রশ্ন করার ক্ষমতা। তাঁরা ক্ষমতাকে ভয় পান না, প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করেন, প্রয়োজনে সজোরে প্রতিবাদ করেন। তাঁদের কাছে সমালোচনা মানে শুধু বিরোধিতা নয়—বরং অন্যায়কে অন্যায় বলার নৈতিক সাহস। আর সেই সাহসই গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
দেবা-পারোর গল্পে সীমান্তের নির্মম বাস্তবতা (Social Commentary)
দেবা ও পারোর কল্পিত গল্পটি যেন সমাজের তৈরি সমস্ত সীমারেখাকে প্রশ্ন করে। দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর কোনও পরিচয় নেই, কোনও দেশের নাগরিকত্ব নেই। অথচ পৃথিবীর তৈরি রাজনৈতিক সীমানা তার জীবনকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সেই শিশুই হয়ে ওঠে পরিচয়, রাষ্ট্র, যুদ্ধ এবং ক্ষমতার রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম প্রশ্ন।

শিশুর হাতে মোবাইল, পৃথিবীর হাতে ধ্বংস
একটি শিশুর হাতে থাকা মোবাইলের ছোট্ট একটি সুইচ যদি গোটা সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, তাহলে প্রশ্নটা শুধু কল্পকাহিনির নয়। যুদ্ধ, পরমাণু অস্ত্র, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার—সব মিলিয়ে আধুনিক সভ্যতার ভঙ্গুরতাকেই এই উপমা সামনে আনে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ইতিহাস কিংবা গাজার ভয়াবহতা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের তৈরি ক্ষমতার কাঠামো কখনও কখনও মানুষের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে।
গ্যালিলিও থেকে আজকের ‘পাগল’ (Social Commentary)
ইতিহাসে বহু মানুষকে তাঁদের সময়ের সমাজ অস্বস্তিকর, বিদ্রোহী কিংবা ভুল বলে মনে করেছে। গ্যালিলিওর উদাহরণ সেই সামাজিক মানসিকতারই প্রতীক। তবে ‘পাগল’ শব্দটি যে সবসময় সত্যের প্রতিশব্দ নয়, সেটিও মনে রাখা জরুরি। কারণ ইতিহাসে যেমন সমাজের ভুল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা মানুষ ছিলেন, তেমনই ক্ষতিকর ও অপরাধপ্রবণ মানুষও ছিলেন। তাই কাউকে শুধু ‘পাগল’ বলে মহিমান্বিত করা নয়—বরং তাঁর কাজ, বক্তব্য এবং প্রশ্নের মূল্যায়ন করাই জরুরি।
আরও পড়ুন: Perfume: গন্ধকে সত্যিই বন্দি করা যায়! ‘পারফিউম’- সিনেমায় রয়েছে সেই রহস্য
সিনেমার চরিত্র নয়, আমাদের চারপাশের মানুষ
দেবা, পারো কিংবা এই ধরনের চরিত্ররা শেষ পর্যন্ত কেবল সিনেমার পর্দায় আটকে থাকে না। শহরের অলিগলি, রাস্তাঘাট, প্রতিদিনের কথোপকথন—সবখানেই তাঁদের ছায়া দেখা যায়। তাঁরা আমাদের শেখান, অস্বাভাবিককে ভয় না পেয়ে তার ভেতরের প্রশ্নটি শুনতে। তাই এই চরিত্রগুলির প্রতি ভালোবাসা, ঘৃণা, আদর কিংবা সমালোচনা—সবই যেন আমাদের সামাজিক বিবেককে নাড়া দেওয়ার অংশ। সিনেমার কাহিনিকার যে ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’-এর জীবদের কথা বলেন, তারা আসলে আমাদের সমাজের গভীরে থাকা সেইসব অস্বস্তিকর সত্য, যাদের এড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।



