Last Updated on [modified_date_only] by Tania Rakshit
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ফুটবল সত্যিই বড় অদ্ভুত! কখন কাকে কোথায় পৌঁছে দেবে, তা আগাম বলে দেওয়ার সাধ্য কারও নেই (Vozinha)। যে মানুষটা একদিন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাবে গোলপোস্ট সামলাতেন, তিনিই এক বিশ্বকাপের রাতে হয়ে উঠেছিলেন গোটা বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে গিয়েছিল তাঁর পরিচয়, জনপ্রিয়তা, জীবনযাপন। ইনস্টাগ্রামে হু হু করে বেড়েছিল অনুসারীর সংখ্যা। বিজ্ঞাপনের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিল অ্যাডিডাস, পেপসি, রেড বুলের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড। এমনকি জায়গা হয়েছিল ব্যালন ডি’অরের মঞ্চেও। কিন্তু রূপকথার সেই নায়ক এখন কোথায়? তাঁর বর্তমান ঠিকানা ক্লাবের বেঞ্চ! নাম ভোজিনহা।
এক রাতেই তারকা হয়ে ওঠা (Vozinha)
পুরো নাম জোসিমার হোসে এভোরা দিয়াস। বয়স ৪০। কেপ ভার্দের এই গোলকিপার বিশ্বকাপে স্পেনের বিরুদ্ধে এমন এক পারফরম্যান্স করেছিলেন, যা তাঁকে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে দেয়। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট স্পেনকে নিজেদের প্রথম ম্যাচে গোল করতে দেননি তিনি। ম্যাচ শেষ হয়েছিল গোলশূন্য ড্রয়ে। এরপর শেষ ষোলোয় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়েছিল কেপ ভার্দে। শেষ পর্যন্ত হারতে হলেও ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে নেয় দলটি। আর ভোজিনহা হয়ে ওঠেন বিশ্বকাপের অন্যতম অপ্রত্যাশিত নায়ক।
দেশের জনসংখ্যার ৫৫ গুণ অনুসারী! (Vozinha)
বিশ্বকাপের আগে ইনস্টাগ্রামে ভোজিনহার অনুসারী ছিল মাত্র ৫০ হাজার। স্পেনের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংখ্যাটা পৌঁছে যায় কয়েক মিলিয়নে। এখন তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ! তুলনাটা আরও অবাক করার মতো। তাঁর নিজের দেশ কেপ ভার্দের জনসংখ্যাই পাঁচ লাখের সামান্য বেশি। অর্থাৎ, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৫ গুণেরও বেশি মানুষ তাঁকে অনুসরণ করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এক রাতের পারফরম্যান্স কীভাবে একজন ফুটবলারের জীবন বদলে দিতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভোজিনহা।
মায়ের জন্য জমে থাকা এক আক্ষেপ (Vozinha)
তবে এই বিশ্বজয়ী জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক বুক কষ্টও। স্পেনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ম্যাচের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনহা। আনন্দে, গর্বে চোখ ভিজেছিল তাঁর। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও ছিল গভীর আক্ষেপ। জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্তটি মাকে গ্যালারিতে বসিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভিসা না মেলায় বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে ছেলের পাশে থাকতে পারেননি তাঁর মা। হাজার হাজার সমর্থকের উচ্ছ্বাসের মাঝেও তাই মায়ের অনুপস্থিতি কষ্ট দিয়েছিল এই গোলকিপারকে।
বিজ্ঞাপনের দুনিয়া থেকে ব্যালন ডি’অরের মঞ্চ (Vozinha)
বিশ্বকাপের পর ভোজিনহার জীবন যেন সিনেমার চিত্রনাট্য মেনে এগোতে থাকে। জুলাইয়ে যোগ দেন চিলির অন্যতম সফল ক্লাব কোলো কোলোতে। ১৯৯১ সালে কোপা লিবার্তোদোরেস জেতা এই ক্লাবে তাঁর পরিচয়পর্বও ছিল রাজকীয়। এসতাদিও মনুমেন্তালে হাজার হাজার সমর্থকের সামনে, আতশবাজির আলোয় তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। বিজ্ঞাপনের দুনিয়াতেও তখন তিনি পরিচিত মুখ। অ্যাডিডাস, পেপসি এবং রেড বুলের প্রচারণায় দেখা যায় তাঁকে। সম্প্রতি লন্ডনে ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানেও হাজির হয়েছিলেন ভোজিনহা। বর্ষসেরা গোলকিপারের পুরস্কারের ভোটে ষষ্ঠ স্থান পেয়েছেন তিনি।
রূপকথার পর বাস্তবের কঠিন লড়াই (Vozinha)
কিন্তু মাঠের বাইরের এই সাফল্যের সঙ্গে মাঠের ছবিটা একেবারেই মেলে না। গত মরশুমেও পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগে খেলেছেন ভোজিনহা। কোলো কোলোতে যোগ দেওয়ার পর নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত সম্ভাব্য ১৪টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে খেলার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। চিলির লিগে শিরোপার দৌড়ে থাকা দলটির পরের ম্যাচ নুবলেনসের বিরুদ্ধে। সেখানেও প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থাৎ, যে গোলকিপারকে একসময় বিশ্বকাপের নায়ক হিসেবে উদ্যাপন করেছে গোটা দুনিয়া, তাঁকেই এখন ক্লাবের বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে হচ্ছে সুযোগের।
ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবতে নারাজ (Vozinha)
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবশ্য এখনই খুব বেশি ভাবতে চান না ভোজিনহা। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, “আমি এখানে এসেছিলাম লিবার্তোদোরেসে খেলার উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে এখন আমার মনোযোগ এই সপ্তাহে। কোলো কোলো দলের জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এরপর আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। এ নিয়ে এখন ভাবছি না।” তাঁর চুক্তির মেয়াদ ছয় মাসের। নির্দিষ্ট সংখ্যক মিনিট মাঠে কাটাতে পারলে চুক্তি আরও এক বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তাই চিলির সংবাদমাধ্যমে এখন একটাই প্রশ্ন—২০২৭ সালেও কি কোলো কোলোর জার্সিতে দেখা যাবে ভোজিনহাকে?
সমালোচনার মুখে বিশ্বকাপের নায়ক (Vozinha)
কোলো কোলোর হয়ে যে পাঁচটি ম্যাচে খেলেছেন ভোজিনহা, সেই ম্যাচগুলিতে দল তিনটি গোল হজম করেছে। পরিসংখ্যান খুব একটা খারাপ নয়। তবু ক্লাবের প্রথম পছন্দ ১৯ বছর বয়সী চিলির গোলকিপার গ্যাব্রিয়েল মাওরেইরা। ফলে ভোজিনহাকে নিয়মিত জায়গা পেতে লড়াই করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সমালোচনাও শুনতে হচ্ছে তাঁকে। বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার সিটির প্রাক্তন গোলকিপার এবং চিলির কিংবদন্তি ক্লদিও ব্রাভোও তাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ব্রাভোর কথায়, দলের অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ভোজিনহা কয়েকটি ভুল করেছেন। আর সেই সমন্বয় না থাকলে ভালো পারফরম্যান্স করা কঠিন।
আরও পড়ুন: Rinku Singh: চোটে ছিটকে গেলেন পাতিদার, রাইজিং স্টারসে বড় দায়িত্বে রিঙ্কু!
আবার কি নতুন ঠিকানা খুঁজতে হবে? (Vozinha)
এক বিশ্বকাপ রাত তাঁকে চিনিয়েছিল গোটা বিশ্বের কাছে। যে গোলকিপারের নাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল কোটি কোটি মানুষের মোবাইলের পর্দায়, আজ তাঁরই ক্লাব ফুটবলে জায়গা পাকা নয় (Vozinha)। কোলো কোলো যদি চুক্তি না বাড়ায়, তা হলে ডিসেম্বরের শেষেই নতুন ক্লাব খুঁজতে হতে পারে ভোজিনহাকে। ফুটবল তাঁকে এক রাতে তারকা বানিয়েছিল, কিন্তু সেই আলো ধরে রাখা যে কত কঠিন, এখন প্রতিদিন তারই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে ৪০ বছরের এই গোলকিপারকে। রূপকথার পরের অধ্যায় কোন পথে এগোবে, আপাতত সেটাই দেখার।



