Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: পূর্ব বর্ধমানের মেমারি মহকুমার গৌরীপুর মধ্যমপাড়ার (Purba Bardhaman) এই ঘটনাটি কেবল একটি জেলাকে নয়, সমগ্র রাজ্যকেই স্তম্ভিত করেছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জনসচেতনতার যুগে দাঁড়িয়েও সমাজের একাংশে কুসংস্কারের শিকড় কতটা গভীর, তা ফের প্রমাণ করল এই হত্যাকাণ্ড।
সেইদিন কি ঘটেছিল! (Purba Bardhaman)
শুক্রবার ভোরবেলা, গৌরীপুর মধ্যমপাড়ার একটি ছোট জলাশয়ের ধারে রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পুলিশ এসে শনাক্ত করে জানান— নিহত লক্ষ্মী হেমব্রম, বয়স প্রায় ৭৫ বছর। তিনি একাই একটি ছোট কুঁড়েঘরে বাস করতেন। স্বামী ও সন্তানদের বহু আগে হারিয়েছেন বা দূরে থাকেন বলে জানা যায়। গ্রামেরই এক ব্যক্তি সনাতন তাঁর খোঁজখবর নিতেন, প্রয়োজনে সাহায্য করতেন।
গত কয়েক মাস ধরে গ্রামে গুজব ছড়িয়েছিল যে, লক্ষ্মী দেবী নাকি “ডাইনি”— অর্থাৎ তিনি জাদুটোনা করে কারও ক্ষতি করছেন। কোনো অসুখ, ফসলের ক্ষতি বা পারিবারিক বিপত্তি ঘটলেই অনেকে সেই অদৃশ্য “অপশক্তির” দায় তাঁর উপর চাপাতে শুরু করে। গ্রামের কিছু মানুষ এর প্রতিবাদ করলেও, অন্ধবিশ্বাসে আচ্ছন্ন কয়েকজন যুবক-যুবতী পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত করে তোলে।
শুক্রবার ভোরে, অভিযোগ অনুসারে, সুজন ওরফে বিমল হাঁসদা, সন্দীপ মুর্মু, বিনয় হাঁসদা এবং সেবা ওরফে শিবা হাঁসদা ওই বৃদ্ধাকে জোর করে বাড়ি থেকে টেনে বের করে আনে। জলাশয়ের ধারে নিয়ে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা ও ঘাড়ে কোপ মেরে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে দেহ জলাশয়ের জলে ফেলে দেওয়া হয়।
কী ছিল পুলিশের ভূমিকা! (Purba Bardhaman)
ঘটনার খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা ভিড় জমায়। খবর সূত্রে জানা যায়, পূর্ব বর্ধমান জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অর্ক ব্যানার্জীর নেতৃত্বে বড়সড় পুলিশবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়েই সন্দেহভাজন চারজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। প্রমাণের ভিত্তিতে ওই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সামাজিক প্রেক্ষাপট ও পূর্ববর্তী ঘটনাবলি (Purba Bardhaman)
ডাইনি অপবাদে নারী, শিশু এমনকি সম্পূর্ণ পরিবার হত্যার ঘটনা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বারবার ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলির পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে ঝাড়খণ্ড, বিহার, ছত্তিশগড়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে ডাইনি সন্দেহে শতাধিক নারী খুন হয়েছেন।
- বিহার, পূর্ণিয়া (জুলাই ২০২৫):
টেটগামা গ্রামে একই পরিবারের পাঁচজনকে “ডাইনি” অপবাদে পুড়িয়ে মারা হয়। গ্রামবাসীরা পুলিশের ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালায়।
- ছত্তিশগড়, বালোদাবাজার (সেপ্টেম্বর ২০২৪):
১১ মাসের শিশু-সহ চারজনকে কুসংস্কারপ্রসূত অভিযোগে হত্যা। অভিযোগ ছিল, নিহত পরিবার “কালাজাদু” করে কারও অসুখ বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
এইসব নৃশংস ঘটনার পেছনে মূল কারণ অশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার অভাব, দারিদ্র্য এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা। কোনো পরিবারে যদি দীর্ঘদিন অসুখ-অসুস্থতা থাকে, বা হঠাৎ মৃত্যু ঘটে, অনেকেই চিকিৎসা-যুক্তি খুঁজে বের করার পরিবর্তে অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যায় আশ্রয় নেন। স্থানীয় প্রথাগত গুণিন বা ওঝারা অনেক সময় এই ভয়ের সুযোগ নিয়ে দোষ চাপান কোনো এক নারী বা বিধবার ঘাড়ে, যিনি সহজ লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞ মতামত কী! (Purba Bardhaman)
মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন,
- ভয় ও অজ্ঞতা: প্রাচীন কালের অচিকিৎসাযোগ্য রোগের কারণ না জানা থাকায় “ডাইনি” বিশ্বাস গড়ে উঠেছিল। আজও শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক ভাবনার অভাবে তা টিকে আছে।
- লিঙ্গ বৈষম্য: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবিবাহিতা, বিধবা, বয়স্কা বা সমাজের প্রান্তিক নারীরা “ডাইনি” তকমার শিকার হন।
- অর্থনৈতিক স্বার্থ: অনেক সময় জমিজমা বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে ঢাকতে ডাইনি অভিযোগ তোলা হয়।
আইন ও প্রতিকার
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইতিমধ্যেই “ডাইনি নির্যাতন বিরোধী আইন” প্রণয়ন হয়েছে। যেমন, ঝাড়খণ্ড ও অসমে “প্রিভেনশন অফ উইচ-হান্টিং অ্যাক্ট” কার্যকর। পশ্চিমবঙ্গেও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড রুখতে আইন প্রয়োগ কঠোর করতে হচ্ছে। প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সচেতনতা কর্মসূচি চালাচ্ছে
- গ্রামে গ্রামে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্য শিবির
- স্কুলে কুসংস্কার বিরোধী শিক্ষা
- মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার

আরও পড়ুন: Daily Horoscope: কর্মফল থেকে নিস্তার নেই, জানুন গ্রহরাজের কৃপার হাত আজ কাদের মাথায়?
মেমারির গৌরীপুর মধ্যমপাড়ার ঘটনা আবারও সতর্ক করল যে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও মানুষের চিন্তাধারায় শতাব্দী প্রাচীন অন্ধবিশ্বাস রয়ে গেছে। আইন-শৃঙ্খলার কঠোর প্রয়োগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি দরকার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সচেতনতা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি। না হলে, ডাইনি সন্দেহে আরও কত প্রাণ ঝরে যাবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।



