Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ‘বন্দে মাতরম’ যে গান একদিন ভারতবাসীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার স্বরকে দৃপ্ত করে তুলেছিল (Bankim Chandra Chattopadhyay), সেই গানের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আজও ভারতীয় জাতির সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যখন দেশজুড়ে তাঁর সৃষ্টি সার্ধশতবর্ষে উদ্যাপন হচ্ছে, তখন হাওড়ায় তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বসতবাড়িটি ধ্বংসের মুখে পড়ে আছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে এই উদাসীনতা গভীর চিন্তার বিষয়।

হাওড়ায় কর্মজীবনের সূচনা (Bankim Chandra Chattopadhyay)
হাওড়া শুধু তাঁর প্রশাসনিক কর্মস্থল ছিল না, ছিল সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষী। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৮১ সালে তিনি হাওড়ায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রথমদিকে কলকাতা থেকে যাতায়াত করলেও পরে ২১৮ পঞ্চাননতলা রোডে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ১৮৮৩ সালে দ্বিতীয় দফায় হাওড়ায় ফিরেও একই বাড়িতে থাকেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর (১৮৮১–১৮৮৬) তিনি এই বাড়িকে নিজের আবাস করে নেন। এই সময়েই তিনি রচনা করেন তাঁর অনন্য প্রবন্ধ ‘মুচিরাম গুরের জীবনচরিত’ যা তার সময়ের সমাজ-বাস্তবতাকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছিল।
পুরোনো কালেক্টরেট ভবনের স্মৃতিচিহ্ন (Bankim Chandra Chattopadhyay)
বঙ্কিমচন্দ্র কাজ করতেন হাওড়ার পুরোনো কালেক্টরেট ভবনের সিনিয়র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চেম্বারে। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন সেই ঘরটি সংরক্ষণ করে, যেখানে রাখা হয়েছে, বঙ্কিমচন্দ্রের ছবি, তাঁর ব্যবহৃত কাঠের টেবিল–চেয়ার, নামফলকসহ স্মৃতিচিহ্ন কিন্তু শুধু একটা ঘর নয়, পুরো ভবনটিই তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও কর্মধারার সাক্ষ্যবাহী। ইতিহাসবিদদের দাবি এটিকেও সম্পূর্ণ হেরিটেজ ঘোষণা করা উচিত।

বাড়ির বর্তমান করুণ অবস্থা (Bankim Chandra Chattopadhyay)
আজ যেটি বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ি হিসেবে পরিচিত, তার অবস্থা বেদনাদায়ক। স্থানীয়দের বক্তব্য, বাড়ি থেকে ইট খসে পড়ছে,, দেয়ালে ফাটল, ছাদের কাঠামো ধসে পড়ার মতো, গোটা বাড়িটি যেন হানাবাড়ির মতো অচলাবস্থায়। সংস্কারের অভাব ও মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাড়িটি দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। অথচ এ বাড়িটির প্রতিটি ইট বঙ্কিমচন্দ্রের বাস, চিন্তা, লেখা ও প্রাত্যহিক জীবনের নিঃশব্দ সাক্ষী।
কোথায় গেল পরিকল্পনা? (Bankim Chandra Chattopadhyay)
হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র রথীন চক্রবর্তীর সময়ে বাড়িটি হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, বাড়িটি অধিগ্রহণ, সেখানে লাইব্রেরি ও সংগ্রহশালা নির্মাণ, এর জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ, কিন্তু বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, মালিকানা-সংক্রান্ত আপত্তির কারণে প্রকল্প থেমে যায়। আজ পর্যন্ত সেই বরাদ্দ অর্থের কোনও স্বচ্ছ হিসাব নেই বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। হাওড়া সিটিজেন ফোরামের সম্পাদক শৈবাল বসুর মতে, “৫ কোটি টাকার কোথায় ব্যয় হয়েছে, তার কোনও তথ্য প্রশাসনের কাছে নেই।” হাওড়া পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুজয় চক্রবর্তীও একই অভিযোগ করেন, “আমরা ক্ষমতায় এসে সেই অর্থের কোনও রেকর্ড পাইনি।” এ যেন প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার এক নগ্ন প্রকাশ।
স্মৃতির বদলে বাণিজ্যিক ব্যবহার (Bankim Chandra Chattopadhyay)
বাড়ির পাশেই রয়েছে বঙ্কিম পার্ক, যা স্থানীয় একটি ক্লাবের তত্ত্বাবধানে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, পার্কটি এখন স্মৃতিরক্ষার স্থান নয়, বরং বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্র, পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দ অর্থও অসৎ ব্যবহারের শিকার ফলে বঙ্কিমচন্দ্রের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি পার্কও হারিয়ে ফেলছে তার মূল উদ্দেশ্য।
আরও পড়ুন: Darjeeling Glenarys: বড়দিনের আগে হঠাৎ কেন তালা ঝুলল দার্জিলিংয়ের গ্লেনারিজে?
ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রশাসনিক ব্যর্থতা
অবহেলার এমন চিত্র কেবল একটি বাড়ির নয় এটি আমাদের সমাজের চিন্তা-চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একজন সাহিত্যসম্রাটের জীবনস্মৃতি যদি এভাবে অযত্নে নষ্ট হতে থাকে, তবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে প্রচারমূলক উদ্যাপন নিছকই বাহুল্য। স্মৃতিবিজড়িত স্থানের গুরুত্ব, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করে, সমাজের সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডকে দৃঢ় করে বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ি সেই দিক থেকে অমূল্য। অথচ বাস্তবে তা রক্ষা পায়নি সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা কিংবা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাবে।



