Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: খাদ্যপ্রেমী জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচিতি বহু প্রাচীন (Abhijan Book Cafe)। উৎসবের দিনে হোক বা শোকের সময়, আনন্দে–বেদনায়, জীবনযাপনের প্রতিটি বাঁকে খাদ্যই বাঙালির অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। এই বিশাল খাদ্যভাণ্ডারের মধ্যে মিষ্টির ভূমিকা যেন সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল। বাঙালি শুধু মিষ্টি খায় না মিষ্টির মধ্যেই তার শৈশব, উৎসব, স্মৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগ বোনা থাকে। এই প্রেক্ষিতেই স্বাতী তলাপাত্রের ‘বঙ্গের মিষ্টান্ন সংস্কৃতি’ বইটি এক অনন্য দলিল বলা চলে। গতকাল প্রকাশিত হল বইটির পঞ্চম মুদ্রণ, পাশাপাশি পালিত হল বইটির বর্ষপূর্তি। অনুষ্ঠানটি পরিণত হয়েছিল বাঙালির মিষ্টি-ঐতিহ্যের প্রতি গভীর ভালবাসার এক আবেগঘন উদযাপনে।

মিষ্টির ভেতরে বাঙালি রসদ বোধ! (Abhijan Book Cafe)
বাঙালির সামাজিক জীবনকে বুঝতে হলে তার খাদ্যাভ্যাসকে বুঝতে হয়। ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশ আগমনের আগে বাঙালির চায়ের পরিচয় ছিল না, পঞ্চদশ শতকে বিদেশি বণিকদের হাত ধরে আলুর আগমন, মধ্যযুগে গুড় ও চিনির বাণিজ্য বাঙালিকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠা দেয়। ঠিক তেমনি মিষ্টিও ক্রমাগত বিবর্তিত হয়েছে। গঙ্গাহৃদি সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক কলকাতা পর্যন্ত মিষ্টির যাত্রা একাধারে নৃতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাস। মুর্শিদাবাদের ছানার জিলিপি, বর্ধমানের সীতাভোগ-মিহিদানা, নবদ্বীপের ল্যাংচা, কলাই বা মসুর ডালের পাকান পিঠে, কলকাতার স্পঞ্জ রসগোল্লা সব মিলিয়ে মিষ্টি শুধু খাদ্য নয়, এক এক অঞ্চল, এক এক পেশা ও মানুষের জীবনের ইতিহাস।

‘বঙ্গের মিষ্টান্ন সংস্কৃতি’ (Abhijan Book Cafe)
মিষ্টিকে ঘিরে বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বে বিশেষ আলোচনা খুব কমই হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে স্বাতী তলাপাত্রের বই। গতকাল বইটির পঞ্চম মুদ্রণ প্রকাশিত হওয়া প্রমাণ করে বাংলার মিষ্টির ইতিহাস জানার আগ্রহ শুধু পণ্ডিতমহলে নয়, সাধারণ পাঠকের মধ্যেও গভীর। অভিযান বুক ক্যাফেতে বইটির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান যেন পরিণত হয়েছিল বাঙালির মিষ্টিপ্রীতির এক সম্মিলিত উৎসবে। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত মতিচুর লাড্ডু দিয়ে তৈরি বিশেষ কেক কাটার মাধ্যমে যা নিজেই সাংস্কৃতিক গৌরবের প্রতীক। শেষ পর্বে পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত কলকাতার স্পঞ্জ রসগোল্লা যা যেন বাঙালির মিষ্টি–যাত্রার স্বীকৃতি।

অনুষ্ঠানের মূল সুর কী ছিল! (Abhijan Book Cafe)
উপস্থিত ছিলেন, সুকান্তি দত্ত, শামিম আহমেদ, বাসব দাশগুপ্ত, গর্গ চট্টোপাধ্যায়, অম্লান দত্ত, দীপককুমার বড়পাণ্ডা, শ্যামলেন্দু চৌধুরি, জয়তী রায়, রাজর্ষিনারায়ণ পত্রনবিশ, সঙ্গীতা আইচ সাহা, তন্ময় মুখোপাধ্যায় সহ বহু সাহিত্যপ্রেমী, গবেষক ও শুভানুধ্যায়ী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অভিযান পাবলিশার্স-এর প্রকাশক মারুফ হোসেন। তাঁর সঞ্চালনায় আলোচনার পরতে পরতে উঠে আসে, বাঙালির মিষ্টি–ঐতিহ্যের বিবর্তন, বিদেশি প্রভাবের দেশজীকরণ, আঞ্চলিক মিষ্টির জন্মপরিস্থিতি, এবং সবচেয়ে বড় কথা মিষ্টি যে শুধুই খাদ্য নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।

আরও পড়ুন: SMLM 2k25: SMLM-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে কত স্বপ্ন সত্যি হয়েছে
বেঁচে থাকা এক জাতি
যে সমাজ চা চিনত না, সে সমাজই আজ চা–বিকেলে রসকদম থেকে রসগোল্লা পর্যন্ত অসংখ্য মিষ্টির পরীক্ষায় বিশ্ববন্দিত। বিদেশি কেকও আজ বাঙালির রান্নাঘরে একেবারে দেশি। ল্যাংচাকে কখনোই “লম্বা গোলাপজামুন” হতে দেয়নি বাঙালি এটাই সাংস্কৃতিক আত্মসম্মানের পরিচয়। শুধু ধর্মীয় উৎসব নয় বাঙালির যেকোনো খুশির মুহূর্তে “মিষ্টি মুখ” যেন এক অনিবার্য সামাজিক প্রথা। সেই প্রথাই বলে মিষ্টি আমাদের স্বভাব, সংস্কৃতি ও স্বকীয়তার অংশ।



