Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল : ১০ জানুয়ারি দুপুর গড়াতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক আতঙ্কিত আবেদন ভেসে উঠতে শুরু করে (Iran Shuts Down)। প্রতিটি বার্তায় একই আকুতি ইরানে থাকা প্রিয়জন কি নিরাপদ? কেউ লিখছেন, “দয়া করে আমার মা–বাবাকে ইরানে ফোন করে জানাবেন আমি দুবাইয়ে নিরাপদে আছি” এক তরুণীর কাতর অনুরোধ, সঙ্গে বাবা–মায়ের নম্বর। আরেকজনের আবেদন, “দয়া করে তেহরানে থাকা আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখবেন, ও ঠিক আছে তো?” কারও বার্তায় হতাশা আরও গভীর—“৪৮ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে, কোনও যোগাযোগ করতে পারছি না।” এই সমস্ত আবেদন জমা হতে থাকে ইরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলে, যা দীর্ঘদিন কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকার পর হঠাৎই হয়ে ওঠে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলোর শেষ আশ্রয়।

হঠাৎ অন্ধকারে ইরান (Iran Shuts Down)
৮ জানুয়ারি থেকে ইরানজুড়ে ইন্টারনেট ও টেলিকম পরিষেবা কার্যত বন্ধ (Iran Shuts Down)। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের প্রেক্ষিতেই এই কড়া সিদ্ধান্ত নেয় ইরান সরকার। এর মাত্র তিন দিন আগেই, ৫ জানুয়ারি, ভারতের বিদেশমন্ত্রক ইরানে অপ্রয়োজনীয় সফর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছিল। যারা ইতিমধ্যেই সেখানে রয়েছেন, তাঁদের সতর্ক থাকতে, বিক্ষোভ এলাকা থেকে দূরে থাকতে এবং ভারতীয় দূতাবাসে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, আচমকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেই সব নির্দেশ মানার সুযোগও অনেকের হাতে আর রইল না।
উদ্বেগে হাজার হাজার ভারতীয় পরিবার (Iran Shuts Down)
যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা হাজার হাজার পরিবারের উদ্বেগ চরমে ওঠে। ইরানে থাকা মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, তীর্থযাত্রী ও অন্যান্য প্রবাসীদের সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছিল না, এমন এক সময়ে যখন দেশের ভেতরে পরিস্থিতি ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে আরও কঠোর নিরাপত্তা দমননীতির দিকে গড়িয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তা।

পুরনো ক্ষত নতুন করে জেগে ওঠা (Iran Shuts Down)
এই উৎকণ্ঠা আরও তীব্র হয়েছে তাঁদের মধ্যে, যাঁরা গত বছরের জুন মাসের দুঃসহ দিনগুলো এখনও ভুলতে পারেননি। ইরান–ইজরায়েল সংঘাতের সময় ‘অপারেশন সিন্ধু’ চালু করে ভারত সরকার প্রায় সাড়ে তিন হাজার নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় বহু মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রী তখন ফের ইরানে ফিরে যান। পরিবারগুলোর মনে হয়েছিল, সবচেয়ে খারাপ সময়টা হয়তো পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নতুন করে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট সেই পুরনো আতঙ্ককেই আবার উসকে দিল।
দূতাবাসের গ্রুপে জমা হওয়া ব্যক্তিগত গল্প (Iran Shuts Down)
ভারতীয় দূতাবাসের অনলাইন গ্রুপে এক ব্যক্তি লেখেন, কোম শহরে থাকা প্রায় ৫০ জন ভারতীয় নাগরিকের খোঁজ চাইছেন তিনি। তাঁর ভাই ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সেখানে গিয়েছেন, কিন্তু এখনও স্থানীয় সিম পাননি। জিপিএস লোকেশন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর যা কিছু সম্ভব, সব দিয়েই অনুরোধ জানিয়েছেন, কোনও খবর জানার জন্য। ইয়াজদ শহর থেকে আরেকটি বার্তায় এক স্ত্রীর অসহায়তা ধরা পড়ে। তাঁর স্বামী আরও ছ’জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে সেখানে কাজ করেন। “৪৮ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে,” লেখেন তিনি, “কোনও খবর নেই।”

ইরানে ভারতীয়দের বড় অংশ (Iran Shuts Down)
বিভিন্ন সূত্রের মতে, বর্তমানে ইরানে প্রায় ১৩ হাজার ভারতীয় ছাত্রছাত্রী মেডিক্যাল পড়াশোনা করছেন। এই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীই এখন পরিবারগুলোর দুশ্চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। ১০ জানুয়ারি ভারতীয় দূতাবাস একটি বিশেষ বার্তায় জানায়, ইসফাহান, শিরাজ, কেরমান ও তেহরান-সহ একাধিক শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদে আছেন। পরদিন আরও একটি আপডেট দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
স্বস্তির বার্তা, তবু অসম্পূর্ণ আশ্বাস (Iran Shuts Down)
১১ জানুয়ারি বিকেলে সেই একই বার্তা আবার পুনরাবৃত্তি করা হয়। জানানো হয়, ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও যারা ঘরের ভিতরে থাকছেন এবং বিক্ষোভ এলাকা থেকে দূরে রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কোনও বিপদের খবর নেই। কিছু পরিবারের কাছে এই বার্তা সাময়িক স্বস্তি এনে দিলেও, যাঁদের সন্তান বা স্বজন অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য শহরে রয়েছেন, তাঁদের উদ্বেগ কাটেনি। এক অভিভাবক ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে পড়ুয়া মেয়ের সহপাঠীদের নম্বর দিয়ে সাহায্য চান। কয়েক ঘণ্টা পর আবার লেখেন, “প্লিজ রিপ্লাই।”
তেহরান থেকে উপকূল (Iran Shuts Down)
বার্তাগুলির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেহরান, ইসফাহান, শিরাজ, কোম, ইয়াজদ থেকে শুরু করে হরমোজগান প্রদেশের বান্দার-ই-বোস্তানুর মতো উপকূলবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় নাগরিকদের উপস্থিতি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই ওঠে এক বাস্তব প্রশ্ন “লোকাল ল্যান্ডলাইন কি কাজ করছে?” বহু জায়গা থেকেই আসে হতাশাজনক উত্তর সেগুলিও অনির্ভরযোগ্য।
ক্ষোভ, প্রশ্ন আর অতীতের অভিজ্ঞতা (Iran Shuts Down)
১১ জানুয়ারি নাগাদ ক্ষোভ বাড়তে থাকে দূতাবাসের চ্যানেল ঘিরেও। কেউ কেউ দিল্লির বিদেশমন্ত্রকের ২৪×৭ কন্ট্রোল রুমে সরাসরি যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন, নম্বর ও ইমেল শেয়ার করেন। একজন প্রশ্ন তোলেন, “আর কতদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে? কবে আমরা নিজেরাই সন্তানদের সঙ্গে কথা বলতে পারব?” এর উত্তরে একজন লেখেন, যিনি ২০১৯ সালের ইরান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট প্রত্যক্ষ করেছিলেন “কেউ জানে না… তখন ১৪ দিন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।”
সরিয়ে আনার দাবি ও ভেতর থেকে আসা খবর (Iran Shuts Down)
ব্ল্যাকআউট তৃতীয় দিনে পা রাখতেই কিছু বার্তা আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। কেউ লেখেন, “পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। আমরা অনুরোধ করছি, ইরানে থাকা সব ভারতীয়কে সরিয়ে আনা হোক।” এর মধ্যেই, ১১ জানুয়ারি গভীর রাতে, ইরানের ভেতর থেকেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আহওয়াজ শহরের এক ভারতীয় ছাত্র ইরাক সীমান্তে পৌঁছে ইরাকি সিম ব্যবহার করে জানান, ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদে আছেন। তবে রাত ৮টার পর বাইরে বেরোনো নিষেধ। ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সমস্ত ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত, শুধুমাত্র ইন্টার্নশিপ করা ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় রয়েছে।

থমকে যাওয়া স্বাভাবিক জীবন
এই বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার খবর যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনই বোঝায় স্বাভাবিক জীবন অনির্দিষ্টকালের জন্য থমকে গেছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। ১৩ জানুয়ারি তেহরান–মুম্বই ইরান এয়ারের একটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ১৪ জানুয়ারির শিরাজ–শারজাহ ফ্লাইট আদৌ হবে কি না।



