Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শতক আসে, শতক যায় কিন্তু সত্যজিৎ রায় প্রাসঙ্গিক থেকে যায় (Satyajit Ray)।
মানিক থেকে সত্যজিৎ (Satyajit Ray)
‘আই উইল গো টু দ্য-টপ! দ্য-টপ! দ্য-টপ!’, সংলাপটি শুনলেই সবার মনে পড়ে যায় সেলুলয়েডের সেই নায়কের কথা যিনি বাংলাইর মননে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছিলেন। ‘নায়ক’ সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ই প্রথম পর্দায় নিয়ে আসলেন তারকার মধ্যে থাকা ‘মানুষ’ উত্তম কুমারকে। যার আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত খ্যাতির চাহিদা আছে, আছে একাকিত্ব আবার মধ্যবিত্ত ক্রাইসিস। কিন্তু সে তাঁর নিজের সম্পর্কে এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে নিজের বন্ধুকে একবারও বলতে ভাবে না ‘আই উইল গো টু দ্য-টপ! দ্য-টপ! দ্য-টপ!’ উত্তম কুমারের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অরিন্দমকে বাঙালি দর্শক সেই সময় পেলেন অন্যরূপে (Satyajit Ray)। বাঙালির মননে যিনি এই কনফ্লিট তুলে ধররেছেন তিনিই বাঙালির মানিক তথা সত্যজিৎ রায়।
বারবার হট টপিকের মত বাঙালির আড্ডাঘরে জায়গা করে নিয়েছে উত্তম কুমার আর সত্যজিৎ রায়ের মধ্যে সম্পর্কের মুখরোচক গল্প। একদিকে উত্তম কুমার মানেই সিনেমায় তাঁর গ্ল্যামার আর সত্যজিৎ রায় মানে বাস্তব চিত্রকে কল্পনার মাধ্যমে কিছুটা সহজ করে দর্শকের সামনে তুলে ধরা। সেখানে বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরাবাস্তববাদ।
গরপাড় রোডের বাড়ির কথা সবার জানা। সেখানেই ১৯২১ সালের ২ মে জন্ম সত্যজিৎ রায়ের। তাঁর তখন নাম মানিক। সুকুমার রায়কে তিনি বাবার থেকেও বেশি করে পেয়েছিলেন সাদা পৃষ্ঠার অক্ষরে। যেখান থেকেই তাঁর মননে তৈরি হয়ে যায় সেই সত্ত্বা যা তাঁকে বসিয়েছে সর্বোচ্চ আসনে। ছবি আঁকতে বরাবরই ভাল পারতেন (Satyajit Ray)।
ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তাঁর কোনও প্রথাগত শিক্ষা ছিল না কিন্তু তাঁর হাতেই জন্ম নিয়েছে একের পর এক কালজয়ী বইয়ের প্রচ্ছদ। শুরুটা বিজ্ঞাপন অফিস থেকে শুরু করে সিগনেট প্রেসে চাকরি। ধীরে ধীরে তাঁর জীবন বাঁক নিতে থাকে অন্য খাতে। তাঁর হাতেই রূপ পায় জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ ও ‘রূপসী বাংলা’র চিত্রণ।

এরপর তিনি ঠিক করলেন করলেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মূল উপন্যাস নিয়ে ছবি বানাবেন। বানালেন ‘পথের পাঁচালী’। সেই ছবির পরেই বাংলা সিনেমার ইতিহাস বদলে যায়। শুধু দেশে নয় বিদেশেও তাঁর সিনেমার প্রশংসা কুড়িয়ে নেয়। কিন্তু তিনিও সমাজের দর্পণ হিসেবেই ব্যবহার করেছেন এই অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমেকে।
সত্যজিৎ রায়কে একটি ছবির নির্দিষ্ট পরিসরে বেঁধে ফেলা কোনওভাবে সম্ভব নয় আর সেই কারণে আশ্রয় নিতে হবে বেশ কয়েকটি সিনেমার। যেখানে তাঁর চিন্তাভাবনার প্রতিফলন কিছুটা হলেও স্পষ্টটা দিতে পারে (Satyajit Ray)।
যে গল্পের হাত ধরে লেখাটার শুরু সেই সিনেমার গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। সে সময় সৌমিত্র-সত্যজিৎ জুটির জয়জয়কার। কিন্তু সেই সময় তিনি ঠিক করলেন ‘নায়ক’ বানাবেন। কিন্তু সিনেমায় মুখ্য চরিত্রে সৌমিত্র নন তাঁর প্রথম এবং শেষ পছন্দ উত্তম কুমার। সেই কথা শুনে সৌমিত্র কিছুটা অভিমানের সুরে সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞেসও করেছিলেন যে তাঁকে কেন তিনি এই সিনেমার মুখ্য ভূমিকায় নিলেন না। সেই সময় দেওয়া সত্যজিৎ রায়ের উত্তর পর্দার ফেলুদার মনঃপূত না হলেও সিনেমা দেখে তিনি বুঝেছিলেন কেন তাঁর জায়গায় উত্তম কুমারকে নিয়েছিলেন প্রফেসর শঙ্কুর স্রষ্টা (Satyajit Ray)।

‘নায়ক’ সিনেমা আদতে দেখতে খুব সোজা একটা গল্পের লাইন বলে মনে হলেও সেটা কিন্তু আদতে নয়। এখানে সিনেমার নায়ক অরিন্দম মুখার্জির মধ্যে মানসিক টানাপড়েনের ছবি বারবার দেখা গেছে। যিনি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে মুখ থুবড়ে পড়ার ভয় পান। সত্যজিৎ রায় বিমূর্ত আঙ্গিকে স্থাপন করেছিলেন পরাবাস্তববাদ। যা ছিল শিল্পসম্মত কিন্তু তীক্ষ্ণ।
অরিন্দমের স্বপ্ন দৃশ্যের কথা সকল দর্শকের মনে গেঁথে থাকবে। সেখানে তিনি তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন এই দৃশ্য। প্রথমে একটা দৃশ্যে দেখা যায় টাকার উপর দিয়ে অরিন্দম হেঁটে যাচ্ছেন স্লো মোশনে সেখানে তাঁর গ্ল্যামার ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু পরক্ষণেই পাল্টে যাচ্ছে সেই চিত্র। দুহাতে টাকার সুখ উপভোগ করতে করতে টাকার স্তুপের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে অরিন্দম। এই দৃশ্য অনেকটা পরে দেখা গিয়েছিল সুপার-ম্যান সিনেমায় (Satyajit Ray)।
দ্বিতীয় ভাগে দেখা যায় শ্মশানের নিস্তবতা, আলোর দীপ্তি ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে, পাল্টে যাচ্ছে আবহসংগীত। চারপাশে অসংখ্য কঙ্কাল আর একটা টেলিফোন রিসিভার। তাহলে কি অসফলতার একটা দিক তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি? তৃতীয় ভাগে অরিন্দম টাকার চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে, চিৎকার করে ডাকছে, “শঙ্করদা! শঙ্করদা!” এই শঙ্করদা যেন অরিন্দমের যৌবনের এক মতাদর্শের প্রতীক। সে তাঁর সাহায্য চাইলেও পাচ্ছে না। সেই শঙ্করদার হাসির দৃশ্যে স্বপ্নের ইতি (Satyajit Ray)।
তবে ওই যে আবার একটাই কথা তাঁকে একটি সিনেমার পরিসরে বেঁধে ফেলা কোনওভাবেই সম্ভব না। ঠিক যেমন রবীন্দ্রনাথকে এক জীবনে বোঝা সম্ভব নয়। ষাটের দশকে শুরুতে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-তে ক্ষয়িষ্ণু ইংরেজপ্রেমী দেশীয় সাহেবদের সঙ্গে তরুণ স্বাধীনচেতা বাঙালির সংঘাত যেমন দেখিয়েছেন তেমন শেষ দিকে এসে ‘শাখাপ্রশাখা’-এ দেখিয়েছেন মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনে কীভাবে সহজে ঢুকে পড়েছে ঘুষ। আবার এক সিনেমায় এক তরুণ চাকরির ইন্টারভিউতে ভিয়েতনামের যুদ্ধকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।
এবার বরং আসা যাক তাঁর শেষ সিনেমা ‘আগুন্তুক’-এ। এখানে এক অদ্ভুত সংঘাত তৈরি হয় যে মনমোহন কথা বলছেন নাকি সত্যজিৎ রায় নিজেই থার্ড ওয়াল ভেঙে কথা বলছেন দর্শকের সঙ্গে। কারণ এখানে মনমোহনের চরিত্রে অভিনয় করা উৎপল দত্ত সেই ষাট-সত্তর দশকে শহরের বুকে দেখা যাওয়া মানুষের প্রতীক। একদিকে যেমন মেধাবী তেমন স্বভাবে বোহেমিয়ান। যে সিনেমায় মধ্যবিত্ত বাঙালির কিছু প্রচলিত ‘মিথ’ ধাক্কা খায় সত্যজিৎ রায়ের কাছে।
মনমোহন মিত্র এবং পৃথ্বীশ সেনগুপ্তের যে কথোপকথন যা কিনা মনে হয়েছে সত্যজিৎ আসলেও সত্যের জিতের কথাই বলছেন। তিনি বাঙালির আড্ডাকে অন্তঃসারশূন্য বলে তোপ দাগেন। মধ্যবিত্ত, শহরের ঝা চকচকে ঠান্ডা বৈঠকখানায় বসে যে আড্ডা, তাকে সত্যজিৎ কোন নজরে দেখতেন, সেটাও যেন মনমোহনের কথায় স্পষ্ট হয়ে যায়। এর পরে আসে স্ট্রাগল-এর কথা। মনমোহন নিজেই বলেন, ‘বাঙালির খুব প্রিয় শব্দ, স্ট্রাগল। আমাকেও করতে হয়েছিল, গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য লড়াই।’ সেখানে তিনি আসল আড্ডার কথাও বলেন সেখান থেকে বোঝা যায় সত্যজিৎ রায় বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন মেধার চর্চাকে।
আজ এই মহীরুহর জন্মদিন যিনি সিনেমার জগতে নিয়ে এসেছিলেন রেনেসাঁস। শেষ বয়সে পেয়েছিলেন অস্কারও। তবে আজও বাঙালির কাছে আসল মানিক বলতে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)। সিনেমার জগতে আজও তিনি রায় ‘দ্য-বস’।


