Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে টলিউডের অন্দরমহলেও (Rudranil Ghosh)। দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একাংশের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে শিল্পীদের কাজের সুযোগ, ছবি মুক্তি এবং সরকারি সাংস্কৃতিক মঞ্চ ব্যবহারে পক্ষপাতিত্ব করা হত। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই পরিস্থিতির বদলের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে বলেই মনে করছেন অনেকে। তারই প্রতীকী ছবি দেখা গেল রবিবার নন্দনে।

‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ ঘিরে নতুন বার্তা (Rudranil Ghosh)
একসময় মুক্তি ঘিরে বিতর্ক ও বাধার মুখে পড়েছিল অভিনেতা তথা বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ অভিনীত ছবি ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’। তৎকালীন সরকারের আমলে ছবিটির নন্দনে প্রদর্শন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও পরে বাধা কাটিয়ে ছবিটি মুক্তি পায়, তবে সেই ঘটনার রেশ থেকে গিয়েছিল টলিউডে।
নতুন সরকারের আমলে ফের নন্দনে ছবিটির স্ক্রিনিং হওয়া অনেকের কাছেই শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তার বহিঃপ্রকাশ। একইসঙ্গে প্রদর্শিত হয় অভিনেত্রী তথা বিজেপি নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি ‘প্রত্যাবর্তন’। রবিবাসরীয় বিকেলে নন্দনের প্রেক্ষাগৃহ তাই যেন হয়ে উঠেছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাস্থল।
টলিউডের দায়িত্বে নতুন কমিটি (Rudranil Ghosh)
কয়েকদিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী টলিউডের সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের উপর। রবিবারের এই অনুষ্ঠান ছিল সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম ধাপ বলেই মনে করা হচ্ছে। নন্দনে উপস্থিত হয়ে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে পরিকাঠামোগত অব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত অবনতি এবং প্রশাসনিক একচেটিয়া মনোভাবের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, “সবে আমাদের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। আমাদের অনেক কাজ করার বাকি। আমরা ধীরে ধীরে সব কাজ করব। শুভেন্দুবাবু আমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছেন আমরা সেই কাজ পালন করছি।”

নন্দনের পরিকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ (Rudranil Ghosh)
রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নন্দনের বর্তমান অবস্থা। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নন্দনের স্ক্রিন ও সাউন্ড সিস্টেমের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “স্ক্রিনের যত্ন, সাউন্ড সিস্টেমের যত্ন পূর্বতন সরকার নেয়নি। সেগুলোর যত্ন দরকার। পক্ষপাতদুষ্ট নয়, এমন কোনও ব্যক্তি দায়িত্বে থাকবেন। কারও একার স্বৈরাচারী রাজত্ব এখানে চলবে না। সবাই মিলে কাজ করবে।” এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক মহলেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই নন্দনকে কেন্দ্র করে ‘ব্যান কালচার’ এবং মতাদর্শগত বিভাজনের অভিযোগ উঠেছিল।
‘ব্যান কালচার’-এর বিরুদ্ধে সরব রুদ্রনীল
রুদ্রনীল ঘোষ এদিন আরও বেশি আক্রমণাত্মক সুরে কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে একটি বিশেষ মতাদর্শের সঙ্গে না মিললে শিল্পীদের নানা বাধার মুখে পড়তে হত। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষ সেই সংস্কৃতিকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। রুদ্রনীলের কথায়, “যারা ব্যান কালচার তৈরি করেছিল মানুষ তাদের ব্যান করে দিয়েছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের আমলে যোগ্যরা কাজ পাবে।” তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে শিল্পীদের জন্য মুক্ত পরিবেশ তৈরির দাবি। তিনি বলেন,“প্রতিটি ক্ষেত্রে যাতে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেওয়া যায়, যোগ্যরা যাতে কাজ করে এরকম কাজের পরিবেশ তৈরি হবে।” উল্লেখযোগ্যভাবে, এদিন তিনি কোনও কনভয় ব্যবহার না করে মেট্রোতে টালিগঞ্জ থেকে নন্দনে আসেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েও তাঁর এই সাধারণ যাতায়াত অনেকের নজর কেড়েছে।
দেবকে ‘ছোট ভাই’ বললেন রূপা
রাজনৈতিক মেরুকরণের আবহেও এদিন সৌহার্দ্যের এক অন্য ছবি তুলে ধরেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। অভিনেতা-প্রযোজক দেবের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। রূপার কথায়, কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দেব শিল্পীসত্ত্বাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি জানান, ‘রঘু ডাকাত’ ছবিতে কাজের প্রস্তাব নিয়ে দেব তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে রূপা বলেন, দেব তাঁর কাছে “ছোট ভাই”-এর মতো। এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে টলিউডে রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে রূপার এই বক্তব্য শিল্পের জায়গাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশা
নতুন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে টলিউডের দায়িত্ব পাওয়া এই শিল্পী-রাজনীতিকদের বক্তব্যে পরিষ্কার, বাংলা সিনেমার পরিকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ এবং শিল্পীদের জন্য মুক্ত পরিবেশ তৈরির উপর জোর দেওয়া হবে। রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, “সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে ভাবে চললে টেকনিশিয়ান, আর্টিস্ট, সিনেমা বাঁচবে সেই দিকে নজর দিতে হবে।” এই বক্তব্যে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান সংকটের ছবিও উঠে আসে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বাড়বাড়ন্ত, প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমে যাওয়া, আর্থিক অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে টলিউড এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। সেই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক সহায়তা এবং নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিবেশ কতটা কার্যকর ভূমিকা নেয়, এখন সেটাই দেখার।

আরও পড়ুন: Derby 2026: আইএসএল ভাগ্য নির্ধারণের ডার্বি! উন্মাদনায় ফুটছে বাংলা
নন্দনের মঞ্চে রাজনৈতিক বার্তা
রবিবারের অনুষ্ঠান শুধুমাত্র দুটি ছবির স্ক্রিনিং ছিল না। এটি ছিল বাংলার সাংস্কৃতিক রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত। একদিকে ‘ব্যান কালচার’-এর বিরুদ্ধে সরব শিল্পীরা, অন্যদিকে প্রশাসনের তরফে সংস্কৃতির ক্ষেত্রকে “সবাইয়ের জন্য উন্মুক্ত” করার আশ্বাস সব মিলিয়ে নন্দনের মঞ্চ যেন হয়ে উঠল পরিবর্তনের প্রতীক।



