Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছেন যাঁদের ঘিরে কিংবদন্তি, বিতর্ক, আবেগ এবং রাজনৈতিক প্রচার সবকিছুই একসঙ্গে জড়িয়ে আছে (Gopal Patha)। গোপাল মুখোপাধ্যায়, যিনি অধিক পরিচিত ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম। একদিকে তাঁকে ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার সময় হিন্দু সমাজের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়, অন্যদিকে অনেকের কাছে তিনি ছিলেন দাঙ্গার রাজনীতির সক্রিয় অংশীদার, এমনকি অপরাধ জগতের এক প্রভাবশালী মস্তান। স্বাধীনতার প্রাক্কালে কলকাতার রক্তাক্ত ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম আজও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
‘পাঁঠা’ নামের নেপথ্যের গল্প (Gopal Patha)
গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামের সঙ্গে ‘পাঁঠা’ শব্দটি যুক্ত হওয়ার কারণ তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং পারিবারিক পেশা। কলকাতার বৌবাজারের মলঙ্গা লেনে তাঁদের বসবাস ছিল এবং কলেজ স্ট্রিট এলাকায় তাঁদের পারিবারিক পাঁঠার মাংসের দোকান ছিল। সেই সূত্রেই তিনি কলকাতার মানুষের কাছে ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনযাত্রা এবং কর্মকাণ্ডের কারণে এই নামের সঙ্গে এক ভিন্ন অর্থও যুক্ত হয়। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন সাহসী প্রতিরোধের প্রতীক, আর সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন সহিংসতার এক নির্মম মুখ।
১৯৪৬: এক অগ্নিগর্ভ সময়ের জন্ম
গোপাল পাঁঠাকে বোঝার জন্য ফিরে যেতে হবে ১৯৪৬ সালের কলকাতায়। ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্বে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত উত্তপ্ত। ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মতবিরোধ এবং পাকিস্তান দাবিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ পালন করে। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের দাবির পক্ষে শক্তি প্রদর্শন। কিন্তু সেই দিন এবং পরবর্তী কয়েক দিনে কলকাতা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সাক্ষী হয়। ইতিহাসে যা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত। হাজার হাজার মানুষ নিহত হন, অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং কলকাতা কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

দাঙ্গার সময় গোপাল পাঁঠার উত্থান (Gopal Patha)
এই দাঙ্গার সময়ই গোপাল পাঁঠার নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নিজস্ব সংগঠিত বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর অনুসারীদের অনেকেই নিজেদের ভারতীয় জাতীয় বাহিনীর (INA) আদর্শে অনুপ্রাণিত বলে দাবি করতেন। বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, গোপাল পাঁঠা এবং তাঁর সহযোগীরা উত্তর ও মধ্য কলকাতার কিছু এলাকায় হিন্দু পরিবারগুলিকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেন। তাঁদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল। পরবর্তীকালে গোপাল নিজেই দাবি করেছিলেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় অবস্থানকারী মার্কিন সেনাদের কাছ থেকে তিনি অস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন। এই ঘটনাগুলির কারণে অনেক হিন্দু পরিবারের কাছে তিনি ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তিনি কি শুধুই হিন্দুদের রক্ষাকর্তা ছিলেন? (Gopal Patha)
গোপাল পাঁঠাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে ‘হিন্দু বীর’ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাঁদের দাবি, মুসলিম লীগের দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হিন্দু সমাজকে রক্ষা করেছিলেন গোপাল পাঁঠা। কিন্তু ইতিহাসবিদদের একাংশ এই সরলীকৃত ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেন। তাঁদের মতে, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ছিল না একতরফা হামলা ও একতরফা প্রতিরোধের ঘটনা। উভয় পক্ষই সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত ছিল এবং প্রতিশোধমূলক আক্রমণও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেই ঘটেছিল। ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জি, সুরঞ্জন দাশ এবং অন্যান্য গবেষকরা দেখিয়েছেন যে দাঙ্গার ঘটনাকে শুধুমাত্র ‘হিন্দু বনাম মুসলমান’ বা ‘রক্ষক বনাম আক্রমণকারী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে আড়াল করে।

গোপাল পাঁঠা কি সাম্প্রদায়িক ছিলেন?
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ একাধিক গবেষক উল্লেখ করেছেন যে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বহু মুসলিম ব্যবসায়ীর সঙ্গেও ছিল। দাঙ্গার আগে তাঁকে কট্টর মুসলিম-বিরোধী নেতা হিসেবে কেউ বিশেষভাবে চিনত না। তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্যে এলাকার প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ—সবকিছুর মিশ্রণ ছিল। ফলে তাঁকে নিছক সাম্প্রদায়িক নেতা হিসেবে চিহ্নিত করাও ইতিহাসের জটিলতাকে অস্বীকার করা হবে।
দাঙ্গার পর: মস্তানের মস্তান (Gopal Patha)
১৯৪৬-৪৭ সালের দাঙ্গার পর গোপাল পাঁঠার নাম কলকাতার অপরাধ জগতেও আলোচিত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে খুন, তোলা আদায়, দখলদারি, রাহাজানি ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। যদিও বহু অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তথাপি কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে তাঁর নাম বারবার উঠে এসেছে। সমালোচকদের মতে, দাঙ্গার সময় তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তাকে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। আবার সমর্থকদের মতে, তিনি ছিলেন এলাকার মানুষের ভরসাস্থল, যাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।

ক্ষমতার অলিন্দে অবাধ যাতায়াত (Gopal Patha)
গোপাল পাঁঠার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ। তিনি বিধানচন্দ্র রায় ও সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি অনুরাগী ছিলেন বলে জানা যায়। স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলেও বহু সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এ কারণেই অনেকের মতে, অপরাধমূলক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে থাকতে পেরেছিলেন।
আজকের রাজনীতিতে গোপাল পাঁঠা (Gopal Patha)
বর্তমান সময়ে গোপাল পাঁঠার নাম নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ১৬ আগস্টকে ‘হিন্দু প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করে এবং গোপাল পাঁঠাকে ‘পশ্চিমবঙ্গের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে স্মরণ করে। তাঁর মূর্তি স্থাপন, রাস্তার নামকরণ এবং স্মরণসভা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও দেখা যায়। অন্যদিকে বামপন্থী ও উদারপন্থী ইতিহাসচর্চার ধারার গবেষকরা মনে করেন, গোপাল পাঁঠাকে একমাত্রিক নায়ক হিসেবে তুলে ধরা ইতিহাসের বিকৃতি। তাঁদের মতে, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ছিল ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্বে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সাংগঠনিক হিংসার সম্মিলিত ফল।

আরও পড়ুন : Suhrawardy Avenue: গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা! দাঙ্গার ইতিহাস থেকে বীরত্বের স্মৃতি
ইতিহাসের খলনায়ক
গোপাল পাঁঠাকে নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়া সহজ নয়। তিনি কি শুধুই হিন্দুদের রক্ষাকর্তা ছিলেন? ইতিহাস তার সরল উত্তর দেয় না। তিনি কি কেবল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নেতা ছিলেন? তাতেও পুরো সত্য ধরা পড়ে না। তিনি কি শুধুই অপরাধ জগতের মস্তান ছিলেন? তাঁর জনপ্রিয়তা ও ঐতিহাসিক প্রভাব সেই ব্যাখ্যাকেও অসম্পূর্ণ করে। সম্ভবত গোপাল পাঁঠা ছিলেন এক অস্থির সময়ের সন্তান যে সময়ে রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, আত্মরক্ষা, ক্ষমতার লড়াই এবং অপরাধ জগতের সীমানাগুলি প্রায়শই একে অপরের সঙ্গে মিশে যেত। তাই তাঁকে বুঝতে হলে রাজনৈতিক প্রচারের চশমা নয়, ইতিহাসের জটিল বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে।



