Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার সংস্কৃতি জগতে এক বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে কলকাতা। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের বিচ্ছেদের পর আবারও এই শহরে পা রাখতে চলেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। সেই ঘটনার পর কেটে গিয়েছে বহু বছর। অবশেষে আগামী ১ আগস্ট তাঁর কলকাতা সফরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে আগ্রহ ও আবেগ। আর এই প্রত্যাবর্তনের ঠিক একদিন আগে, ৩১ জুলাই, আবারও প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে পরিচালক চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের বহুল প্রশংসিত চলচ্চিত্র ‘নির্বাসিত’। যেন বাস্তব ও শিল্প এক সুতোয় গাঁথা হয়ে ফিরে আসছে দর্শকের সামনে।

এক লেখিকার দীর্ঘ যন্ত্রণা (Taslima Nasrin)
তসলিমা নাসরিনের জীবন শুধুই একজন সাহিত্যিকের জীবন নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক বিতর্ক এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের এক দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধিতা এবং নারীর অধিকার নিয়ে লেখালেখির কারণে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। পরে ভারত, বিশেষত কলকাতাকে তিনি নিজের সাংস্কৃতিক আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং পাঠকের কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে এই শহরের প্রতি গভীরভাবে টেনে রেখেছিল। কিন্তু ২০০৭ সালে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে তাঁকে কলকাতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমে তাঁকে গোপন নিরাপত্তা কেন্দ্রে রাখা হয়, পরে দিল্লিতে চলে যেতে হয়। সেই ঘটনাই তাঁর জীবনের দ্বিতীয় নির্বাসন হিসেবে ইতিহাসে থেকে যায়।
একাকীত্বের সিনেমাটিক দলিল (Taslima Nasrin)
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালিত ‘নির্বাসিত’ কেবল একটি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়। এটি একজন মানুষের নিঃসঙ্গতা, ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা এবং নিজের ঘর হারানোর যন্ত্রণার শিল্পসম্মত প্রকাশ। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বয়ং চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়। গল্পের অন্যতম আবেগঘন অংশ জুড়ে রয়েছে তসলিমা নাসরিন এবং তাঁর প্রিয় পোষ্য বিড়াল ‘মিনু’-র সম্পর্ক। কলকাতা ছাড়ার সময় মিনুকে সঙ্গে নিতে না পারার যন্ত্রণা ছবিতে এক গভীর মানবিক মাত্রা যোগ করেছে। একজন লেখকের জীবনে ভাষা যেমন অস্তিত্ব, তেমনই একটি প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কও হয়ে ওঠে আবেগের আশ্রয়। এই দুই বিচ্ছেদ শহর থেকে এবং মিনুর থেকে ছবির মূল সুর।

বাস্তব লোকেশনে নির্মিত হয়েছিল ‘নির্বাসিত’ (Taslima Nasrin)
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ছবিটিকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যেতে তাঁরা সেই সব জায়গাতেই শুটিং করেছিলেন, যেখানে তসলিমাকে নিরাপত্তার স্বার্থে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, তসলিমার একাকীত্ব, নিঃসঙ্গ জীবন এবং পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে নতুন করে জীবন শুরু করার অভিজ্ঞতাকেই ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে। এই বাস্তব লোকেশন ছবির আবেগকে আরও বিশ্বাসযোগ্য এবং শক্তিশালী করে তুলেছে।
‘ভারতকেই বেছে নিয়েছিলেন তসলিমা’ (Taslima Nasrin)
এক সাক্ষাৎকারে চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, তসলিমা নাসরিন চাইলে সহজেই ফ্রান্সের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারতেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। আন্তর্জাতিক মহল থেকেও সে ধরনের সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি। বরং তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি বাংলা ভাষা এবং বাঙালিদের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে ভৌগোলিক দূরত্বের চেয়ে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চূর্ণীর মতে, এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে বাংলা ভাষার প্রতি তসলিমার গভীর ভালোবাসা।
ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা (Taslima Nasrin)
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, একদিন তসলিমা তাঁকে বলেছিলেন, “এভাবে বাংলা ভাষার বিবর্তনটা বুঝতে পারছি না।” এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে নির্বাসনের প্রকৃত কষ্ট। একজন লেখকের কাছে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষাই তাঁর জীবন, চিন্তা, সাহিত্য এবং সৃষ্টির ভিত্তি। বাংলা ভাষার পরিবর্তন, নতুন শব্দ, নতুন সাহিত্যধারা এসবের থেকে দূরে থাকতে হওয়াটা তসলিমার কাছে ছিল এক গভীর মানসিক যন্ত্রণা।

পুনর্মুক্তি শুধু সিনেমার নয়, এক প্রতীকী উদযাপনও
৩১ জুলাই ‘নির্বাসিত’-এর পুনর্মুক্তি কেবল একটি সফল ছবির পুনরায় প্রেক্ষাগৃহে আসা নয়। এটি যেন ইতিহাসের একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার মুহূর্ত। চূর্ণীর মতে, তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফিরে এসে এই ছবি নিজে প্রেক্ষাগৃহে বসে দেখা, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না। তিনি বলেন, এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জয় নয়; বাংলা সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।



