Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ত্রয়ণ চক্রবর্তী: রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পরেও কি সত্যিই বদলেছে সাধারণ মানুষের পরিস্থিতি? নাকি শুধু ক্ষমতার মুখ বদলেছে, অথচ শাসনের চরিত্র রয়ে গিয়েছে একই? এমনই একাধিক প্রশ্ন তুলে বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন বক্তা। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, আগের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আর কতদিন আলোচনা চলবে? মানুষ যখন পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, তখন ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের কাজের হিসাবও এবার চাইতে হবে (Adhir Ranjan Chowdhury)।
তাঁর কথায়, তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে চুরি, দুর্নীতি, তোলাবাজি থেকে শুরু করে বালি, পাথর, খাদান এবং গরু পাচারের মতো নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠেছে। সেই সমস্ত অভিযোগ ও শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের কারণেই রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, পুরনো সরকারের ব্যর্থতা দেখিয়ে নতুন সরকার আর কতদিন নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারে?
‘যারা ক্ষমতায় এসেছে, এবার তাদের কাজের হিসাব চাই’
বক্তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সরকার চলে যাওয়ার পরে শুধুমাত্র সেই সরকারের দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সমস্যাগুলিকে আড়াল করা ঠিক নয়। তাঁর প্রশ্ন, “এখন যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা কী করছে?” বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কতটা সহজ হয়েছে, তাঁদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এই বিষয়গুলিই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের নির্যাস, সরকারের পরিচয় নয়, তার কাজই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি।
সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ বাড়ছে? (Adhir Ranjan Chowdhury)
বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে বক্তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে করের বোঝা বাড়ছে এবং বিদ্যুতের খরচ নিয়েও মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির অতীতের দুর্নীতি নিয়ে বিতর্ক করার পরিবর্তে বর্তমানের অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে তাঁর দাবি। একটি পরিবারের মাসিক আয় কত, সেই তুলনায় বিদ্যুৎ, কর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে এসব প্রশ্নই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তিনি।
‘ফ্রি’ পরিষেবার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কেন শর্ত? (Adhir Ranjan Chowdhury)
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন বক্তা। তাঁর দাবি, মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের সময়ে বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে। একইভাবে ‘অন্নপূর্ণা’ প্রকল্পের আর্থিক সুবিধা নিয়েও তাঁর অভিযোগ, সকলের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরে আবেদন ও যোগ্যতার ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত আরোপ করা হচ্ছে।
তাঁর বক্তব্য, “এখানে কোনও কিছু ফ্রিতে হয় না।”
অর্থাৎ নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি সহজভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পরে সেই সুবিধা পাওয়ার পথে যদি একের পর এক শর্ত তৈরি হয়, তাহলে প্রতিশ্রুতির উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
‘দাবি পূরণ না হলে আন্দোলনে নামব’ (Adhir Ranjan Chowdhury)
তবে বক্তার বক্তব্য শুধু সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান সরকারের উদ্দেশে সরাসরি আন্দোলনের বার্তাও রয়েছে। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া যদি পূরণ না হয়, তাহলে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পথ বেছে নেওয়া হবে। এই অবস্থান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেই সরকারের প্রতি প্রশ্ন করা বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটা নয়। বরং যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে তাকে একইভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে এটাই তাঁর বক্তব্য।
পুরনো দুর্নীতির গল্প আর কতদিন? (Adhir Ranjan Chowdhury)
বক্তার মতে, তৃণমূল আমলে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। সেই সমস্ত অভিযোগ মানুষের সামনে এসেছে এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক লড়াইও হয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও যদি বারবার আগের সরকারের দুর্নীতিকেই সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হয়, তাহলে বর্তমান সরকারের কাজের মূল্যায়ন কখন হবে সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সুরে তাই একপ্রকার বিরক্তিও স্পষ্ট পুরনো দুর্নীতির আলোচনা দিয়ে বর্তমানের সমস্যার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েও প্রশ্ন
এর পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বক্তা। তাঁর অভিযোগ, যাঁদের বিরুদ্ধে একসময় দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ তুলে আক্রমণ করা হয়েছিল, রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের পরে তাঁদের একাংশের প্রতি মনোভাবও বদলে যাচ্ছে। NCPI এবং তথাকথিত ‘বিদ্রোহী তৃণমূল’-এর প্রসঙ্গ টেনে তাঁর দাবি, অতীতে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাঁদেরই একাংশ নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ বা গোষ্ঠীতে জায়গা পাচ্ছেন। এই সমস্ত ব্যক্তিদের পিছনে রাজনৈতিক মদত কার? যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না, তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
‘একই যাত্রায় পৃথক ফল কেন?’ (Adhir Ranjan Chowdhury)
পুরো বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে এসেছে এখানেই। “একই যাত্রায় পৃথক ফল কেন?” বক্তার অভিযোগ, একই ধরনের অভিযোগে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্য কেউ রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ দেখা যাচ্ছে। যদি দুর্নীতি সত্যিই অপরাধ হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক অভিযুক্তের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত এটাই তাঁর বক্তব্য।
‘তৃণমূল যা করেছে, বিজেপিও কি সেই পথেই?’ (Adhir Ranjan Chowdhury)
আরও একধাপ এগিয়ে বর্তমান শাসক বিজেপির বিরুদ্ধেও একই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসরণের অভিযোগ তুলেছেন বক্তা। তাঁর দাবি, অতীতে তৃণমূলে যোগদান করলে অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণের তীব্রতা কমে যেত বলে অভিযোগ উঠত। এখন বিজেপিকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সমর্থন করলেও একই ধরনের রাজনৈতিক ছাড় পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। অর্থাৎ দল পরিবর্তন করলে কি অতীতের অভিযোগও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে? এই প্রশ্নের উত্তরই তিনি বর্তমান সরকারের কাছে চাইছেন।

‘বাংলা কি তাহলে দুর্নীতিগ্রস্তদের হাত থেকে উদ্ধার পেল?’
রাজনৈতিক পালাবদলের আসল উদ্দেশ্য যদি হয় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন, তাহলে শুধু সরকার বদলানো যথেষ্ট নয় শাসনব্যবস্থার চরিত্রও বদলাতে হবে বলে বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে। সেখান থেকেই প্রশ্ন বাংলা কি সত্যিই দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে? নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে সঙ্গে শুধু ব্যক্তি এবং দলের নাম পরিবর্তিত হয়েছে?
নাম বদলালেই কি পরিবর্তন আসে?
বক্তার গোটা বক্তব্যের সারমর্ম ধরা পড়েছে তাঁর শেষ মন্তব্যে, “এক দুর্নীতিগ্রস্তের জায়গায় আরেক দুর্নীতিগ্রস্ত আসে। এক তোলাবাজের জায়গায় আরেক তোলাবাজ আসে। নাম পাল্টায়, কাম পাল্টায় না।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি তাঁর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হয়। করের বোঝা, বিদ্যুতের খরচ, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই মানুষ ফলাফল দেখতে চায়।



