Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: আগামী ২২ আগস্ট, শনিবার বিকেল ৫টায়, যাদবপুরের রিজেন্ট এস্টেটে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এক বিশেষ সাহিত্য-সিনেমার আসর (Presidency Boarding)। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, কবি ও গবেষক গৌতম মিত্রের আয়োজনে নীল ঘোষের ৪০ মিনিটের ছবি ‘জীবনানন্দের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং ও তার গ্রহাণুরা’ প্রদর্শিত হবে। আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় এই আয়োজন মূলত জীবনানন্দ-অনুরাগী নির্বাচিত কয়েকজনের জন্য এক অন্তরঙ্গ সাহিত্যিক সন্ধ্যা হয়ে উঠতে চলেছে।

জীবনানন্দকে জানার সেই অপূর্ণ খিদে (Presidency Boarding)
তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন এক কবি, যাঁকে পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়, আরও কিছু জানার ছিল। তাঁর কবিতার মতোই তাঁর জীবনও রহস্যময়, নীরব এবং বহুস্তরীয়। তিনি অনেক প্রশ্ন রেখে গিয়েছেন, কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর নিজে দিয়ে যাননি। তাই আজও তাঁর জীবন, তাঁর মনন, তাঁর সম্পর্ক এবং তাঁর সময়কে ঘিরে আমাদের কৌতূহলের শেষ নেই। কখনও মনে হয়, মানুষটি যদি আজও পাশে বসতেন, তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা যেত—“আপনি কি ট্রাম লাইনটা দেখতে পাননি?” কিন্তু সেই সুযোগ আর নেই। থেকে গেছে তাঁর লেখা, ডায়েরি, পাণ্ডুলিপি এবং অজস্র অনুচ্চারিত প্রশ্ন।
গৌতম মিত্রের দীর্ঘ জীবনানন্দ-অনুসন্ধান (Presidency Boarding)
জীবনানন্দ-চর্চায় গৌতম মিত্রের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি জীবনানন্দের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, খাতা ও দিনলিপি উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং সম্পাদনার কাজে যুক্ত রয়েছেন। ফলে জীবনানন্দকে শুধু কবি হিসেবে নয়, একজন জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত এবং গভীরভাবে আত্মসচেতন মানুষ হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর গবেষণায়। এই ছবির আয়োজনও সেই অনুসন্ধিৎসারই একটি সম্প্রসারণ বলে মনে করা যায়।
এক মেসবাড়ির ভেতরে সময়ের ইতিহাস (Presidency Boarding)
কলকাতার মেসবাড়ি শুধু থাকার জায়গা ছিল না; সেখানে তৈরি হয়েছিল অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক জীবনকাহিনি। প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংও তার ব্যতিক্রম নয়। সেখানে বসবাসকারী মানুষ, তাঁদের সম্পর্ক, কথাবার্তা, অভ্যাস এবং সময়ের সামাজিক টানাপোড়েন জীবনানন্দের সাহিত্য ও ডায়েরিতে নানা ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বিষ্ণু দে, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মতো সমকালীন সাহিত্যিকদের পাশাপাশি উঠে এসেছে আরও অনেক পরিচিত-অপরিচিত মানুষের উপস্থিতি।
উপন্যাসে জীবন, সাহিত্যে ব্যক্তিমানুষ (Presidency Boarding)
জীবনানন্দের উপন্যাসে তথাকথিত নাটকীয় প্লটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের ভেতরের টানাপোড়েন। ব্যক্তিজীবন, সংসার, সম্পর্ক, না-পাওয়া, একাকিত্ব এবং চারপাশের বাস্তবতা তাঁর লেখায় একাকার হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বুদ্ধদেব বসু, সমকালীন বহু ব্যক্তিত্বের ছায়াও তাঁর লেখার জগতে এসে পড়ে। ফলে তাঁর উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি শুধু সাহিত্যকর্ম নয়, হয়ে ওঠে একটি সময়ের মানসিক ও সামাজিক দলিল।
‘মাল্যবান’-এ সংসার ও আত্মসংঘাত (Presidency Boarding)
‘মাল্যবান’-এর মতো উপন্যাসে জীবনানন্দ দেখিয়েছেন একজন লেখকের ব্যক্তিমানুষের সংকট। ভালো পিতা ও স্বামী হওয়ার সামাজিক প্রত্যাশা এবং লেখক হিসেবে নিজের অন্তর্গত পৃথিবীর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা সেখানে গভীরভাবে প্রতিফলিত। সংসার চালানোর দায়িত্ব, ভালোবাসার কোমল স্পর্শ, না-পাওয়ার বেদনা এবং রাতের নিঃসঙ্গতায় কবিতার জন্ম—সব মিলিয়ে জীবনানন্দের সাহিত্য হয়ে ওঠে তাঁর নিজের জীবনেরও এক জটিল আয়না।
ডায়েরির পাতায় সময়ের অদৃশ্য ইতিহাস
বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দের ডায়েরি এক অনন্য দলিল। চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ, ব্যক্তিগত অনুভূতি, পরিচিত-অপরিচিত মানুষ এবং সময়ের নানা সংকেত তাঁর ডায়েরির পাতায় বিশেষ ভাষায় ধরা পড়েছে। প্রতিটি অক্ষরের মধ্যে যেন একটি সময় নিঃশব্দে বেঁচে আছে। সেই পাতাগুলিতে শুধু একজন কবির ব্যক্তিগত জীবন নয়, ধরা পড়ে একটি যুগের সামাজিক ও সাহিত্যিক পরিবেশ। তাই তাঁর ডায়েরি পাঠ মানে অনেকটা সময়ের গোপন দরজা খুলে দেখা।
আরও পড়ুন: Kolkata Airport: বিমানের ককপিটে লেজারের ঝলক, আতঙ্কে পাইলট
২২ আগস্টের সন্ধ্যায় ফিরে দেখা এক অসমাপ্ত মানুষকে
জীবনানন্দের জীবন যেন একটি অসমাপ্ত বাক্য। যত পড়া যায়, ততই নতুন প্রশ্ন জন্ম নেয়। তাঁর রাত, তাঁর ট্রামলাইন, তাঁর মেসজীবন, তাঁর সংসার, তাঁর ডায়েরি সবকিছু মিলিয়ে তিনি একই সঙ্গে পরিচিত এবং অধরা। ২২ আগস্টের সন্ধ্যায় নীল ঘোষের ছবি সেই অধরা জীবনানন্দকে নতুন করে দেখার একটি সুযোগ এনে দেবে। ৪০ মিনিটের এই চলচ্চিত্র হয়তো জীবনানন্দকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করবে না বরং তাঁর চারপাশে জমে থাকা প্রশ্নগুলিকে আরও গভীর করে তুলবে। আর সত্যিকারের জীবনানন্দ-চর্চার সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরও কিছু প্রশ্নের জন্ম দেওয়া।



