Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: গত দুই রবিবার এশিয়া কাপে যা হয়েছিল, এই রবিবারও তার অন্যথা হল না(Asia Cup Final 2025)। নাটকীয় এশিয়া কাপের রোমাঞ্চকর ফাইনালে আবারও পাকিস্তানকে হারিয়ে নবমবার চ্যাম্পিয়ন ভারত। দুই বল বাকি থাকতেই পাঁচ উইকেটে জিতে অপরাজেয় থেকেই এশিয়া কাপের খেতাব নিজেদের দখলে রাখল গতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত। দুর্গা পুজোর বোধনেই হারের হ্যাটট্রিকের মালা পরিয়ে পাকিস্তানের বিসর্জন করলেন কুলদীপ যাদব, তিলক বর্মারা।
অভিষেক শর্মা শুরু করেছিলেন। আর শেষটা করলেন তিলক বর্মা। যোগ্য সঙ্গত করলেন বাঁহাতি স্পিনার কুলদীপ যাদব। এই তিন বাঁহাতি মিলেই পাকিস্তানের চরম সর্বনাশটা করলেন। পাকিস্তানকে হারানো যে ভারতের কাছে ‘বাঁ হাতের খেলা’, তা প্রমাণ করে দিলেন তিনজনে।
টসে জিতে প্রথমে ব্যাট পাকিস্তান (Asia Cup Final 2025)
এদিন টসে জিতে পাকিস্তানকে প্রথমে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিলেন ভারত অধিনায়ক (Suryakumar Yadav) সূর্যকুমার যাদব(Asia Cup Final 2025)। কিন্তু শেষ দুই ম্যাচে জিতে মোমেন্টাম ফিরে পাওয়া পাকিস্তানের দুই ওপেনিং ব্যাটসন শাহিবজাদা ফারহান এবং ফকর জামান মিলে অপ্রত্যাশিত একটা শুরু করেন। এই দুই ওপেনার এদিন ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে যেভাবে শুরুটা করেছিলেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছিল অনেক কিছুর জবাব দিতে তাঁরা তৈরি হয়েই নেমেছেন। চোটের কারণে ফাইনালে ছিটকে গিয়েছিলেন ভারতের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া। তাঁর জায়গায় টুর্নামেন্টে প্রথমবার প্রথম একাদশে জায়গা পান রিঙ্কু সিং।
হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ ফারহানের (Asia Cup Final 2025)
টুর্নামেন্টের প্রতি ম্যাচেই নতুন বল হাতে তুলে নিয়েছিলেন হার্দিক। কিন্তু, তিনি না থাকায় এদিন নতুন বল শিবম দুবের হাতে তুলে দেন সূর্য(Asia Cup Final 2025)। কিন্তু, এদিন শুরু থেকেই বুমরা, দুবে, অক্ষর প্যাটেল, কুলদীপ যাদব, বরুণ চক্রবর্তীদের চেপে ধরার সুযোগই দেননি ফারহান-ফকর জুটি। ৯ উইকেটে এই ওপেনার মিলে ৭৭ রান তোলেন। তার মধ্যে নিজের হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করে ফেলেন ফারহান। গত ম্যাচেও ভারতের বিরুদ্ধে অর্ধশতরন করেছিলেন তিনি। সেই সময় হায় ভারতীয় বোলারদের দেখে মনে হচ্ছিল পাকিস্তান বড় ইনিংস খেলতে চলেছে। দুবাইয়ের গ্যালারিতে উপস্থিত ভারতীয় সমর্থকদের বুকেও তখন কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিল।

দশম ওভার থেকেই ম্যাচ ঘুরতে শুরু করে(Asia Cup Final 2025)
কিন্তু দশম ওভার থেকেই ম্যাচ ঘুরতে শুরু করে। ওই ওভারের চতুর্থ বলে শাহিবজাদা ফারহানকে ফিরিয়ে বিপদজনক হয়ে ওঠা জুটি ভাঙেন বরুণ চক্রবর্তী(Asia Cup Final 2025)। ৩৮ বলে ৫ বাউন্ডারি ও তিন ওভার বাউন্ডারির সাহায্যে ৫৭ রান করে তিলক বর্মার হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। ফারহান ফিরতেই পাকিস্তান ব্যাটিংয়ের জারিজুড়ি সব খতম। এরপর কুলদীপ, বরুণ, অক্ষর- ভারতের এই স্পিন ত্রিফলার খোঁচায় পাশের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ। তা মনে হয় পাকিস্তান বলেই সম্ভব।
সাইম আয়ুবকে নিয়ে আরও একটা পার্টনারশি করার চেষ্টা করেছিলেন ফকর(Asia Cup Final 2025)। কিন্তু ১৩তম ওভারে আয়ুবকে (১৪) ফিরিয়ে দ্বিতীয় ধাক্কাটি দেন এবার কুলদীপ। আয়ুব যখন আউট হন তখন ১২.৫ ওভারে ২ উইকেটে পাকিস্তানের রান ১১৩। সেখান থেকে ১৯.১ ওভারে ১৪৬ রানে অল আউট হয়ে গেল পাকিস্তান। ৩৩ রানের মধ্যে বাকি ৮ উইকেট পড়ল!
মহম্মদ হ্যারিসকে শুন্য়তে ফিরিয়ে দেন(Asia Cup Final 2025)
১৪তম ওভারে মহম্মদ হ্যারিসকে খাতা খোলার আগেই ফিরিয়ে দেন অক্ষর(Asia Cup Final 2025)। পরের ওভারেই আবার দুরন্ত ব্যাট করা ফকর জামানকে প্যাভিলিয়নের ফেরান সেই বরুণ। ৩৫ বলে দু’টি করে বাউন্ডারি ও ওভার বাউন্ডারির সাহায্যে ৪৬ রান করে আউট হন পাক ওপেনার। ফারহান, ফকর ও আয়ুব ছাড়া পাকিস্তানের আর কোনও ব্যাটসম্যানই দুই অঙ্কের রানে পৌঁছতে পারলেন না।
পাক অধিনায়ক সলমন আঘা (৮), শাহিন আফ্রিদি (০), ফাহিম আশরফও(০) কুলদীপের শিকার। হুসেন তালাতকে (১) ফেরালেন অক্ষর। মহম্মদ নওয়াজ (৬) এবং হ্যারিস রউফকে (৬) আউট করলেন বুমরা। যার দৌলতে পুরো ২০ ওভারও খেলতে পারল না পাকিস্তান। ১৯.১ ওভারেই ১৪৬ রানেই গুটিয়ে যায় তাদের ইনিংস।
বলের গতি কমাতেই বাজিমাত(Asia Cup Final 2025)
প্রথমদিকে ভারতীয় বোলাররা বেশি গতিতে বল করায় খেলতে সুবিধা হচ্ছিল পাক ব্যাটারদের(Asia Cup Final 2025)। কিন্তু, এদিন দুবাইয়ের মন্থর উইকেটে সেই ভুল শুধরে বলের গতি কমাতেই বাজিমাত করে গেলেন ভারতীয় বোলাররা। তাই প্রথম নয় ওভার যদি হয় পাকিস্তানের। তাহলে শেষের দশ ওভার ভারতীয় বোলারদের। টুর্নামেন্টের সেরা স্পিনার ও সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি কুলদীপ যাদব ৪ ওভারে ৩০ রান দিয়ে নিলেন ৪ উইকেট। দু’টি করে উইকেট পেলেন অক্ষর, বুমরা এবং বরুণ।
তিন স্পিনার ১২ ওভার বল করে ৮৬ রান দিয়ে নিলেন ৮ উইকেট। সেইসঙ্গে এ দিন মাঠের জবাব মাঠেই দিয়ে এলেন বুমরা। গত ভারত ম্যাচে মাঠে ভারতের ফাইটারজেট ভেঙে নামানোর অঙ্গভঙ্গি করেছিলেন পাক পেসার হ্যারিস রউফ। এদিন তাঁকে ক্লিন বোল্ড করে রউফকে তার সেলিব্রেশানে ফিরিয়ে দিলেন বুমরা।
শুরুতেই ভারতকে মহা চাপে ফেলে(Asia Cup Final 2025)
গোটা টুর্নামেন্টে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা, বিশেষ করে অভিষেক শর্মা যেভাবে ব্যাট করেছেন তাতে ১৪৭ রানের টার্গেট খুব একটা কঠিন ছিল না(Asia Cup Final 2025)। কিন্তু সব দিন সমান যায় না। মন্থর উইকেটে ‘স্লোয়ার’ অস্ত্র ব্যবহার করে শুরুতেই ভারতকে মহা চাপে ফেলে দেন দুই পাক পেসার ফাহিম আশরফ ও আফ্রিদি। দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে ফাহিমের স্লোয়ারে মারতে গিয়ে রউফের হাতে জমা পড়েন অভিষেক শর্মা (৫)। গত তিন ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি করা অভিষেক যে আক্রমণাত্মক ঢঙ্গে শুরু করতেন তাতে ভারতের বড় রান তোলা বা জেতা অনেকটাই সহজ হয়ে যেত।
কিন্তু ফাইনালে তিনি দ্রুত ফিরে যাওয়ায় একটু চাপে পড়ে যায় ভারত। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরের ওভারেই স্লো বলে সূর্যকুমার যাদবকে (১) বোকা বানান আফ্রিদি। প্রথম তিন ওভার এর মধ্যেই দুই উইকেট হারিয়ে রীতিমতো চাপে পড়ে যায় ভারত। চতুর্থ ওভারের শেষ বলে অপর ওপেনার শুভমন গিলকে (১৪) ফিরিয়ে ভারতকে তৃতীয় ধাক্কাটি দেন সেই আশরফ। ২০ রানের মধ্যে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ায় ভারতের ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে গ্যালারিতে তখন টেনশনের ছাপ স্পষ্ট।
মিডিল অর্ডার নিয়ে প্রচুর সমালোচনা(Asia Cup Final 2025)
গোটা টুর্নামেন্টে ভারতের মিডিল অর্ডার নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে(Asia Cup Final 2025)। অভিষেকের দুরন্ত শুরুতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল মিডিল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা। কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতিতে ভারতের ত্রাতা হয়ে দাঁড়ালেন দুই মিডিল অর্ডার তিলক বর্মা এবং সঞ্জু স্যামসন। চতুর্থ উইকেটে দু’জনের অত্যন্ত মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ ৫৭ রানের পার্টনারশিপ সেই চাপ কাটিয়ে দেয়। মারার বলে মারলেন এবং শর্ট রান নিয়ে ভারতের স্কোরবোর্ডকে সচল রেখে ঘাড়ে চেপে বসা টেনশনও নামালেন দু’জনে।
তবে ৮.২ ওভারে ৫১ রানের মাথায় আবরারের বলে ডিপ মিড অনে স্যামসনের ক্যাচ ফেলেন তালাত। তখন স্যামসন ১২ রানে ব্যাট করছিলেন। তারপর যদিও বেশিদূর এগোতে পারেননি স্যামসন। ১৩তম ওভারে আবরার স্যামসনকে ফিরিয়ে সেট হয়ে যাওয়া জুটি ভেঙ্গে আবার পাকিস্তানের আশার আলো জাগিয়ে তোলেন। ২১ বলে দুই বাউন্ডারি ও এক ওভার বাউন্ডারির সাহায্যে মূল্যবান ২৪ রান করে আউট হন স্যামসন। ভারতের চতুর্থ উইকেট পড়ে ৭৭ রানে।
লক্ষ্যে অবিচল তিলক বর্মা(Asia Cup Final 2025)
জুটি ভাঙলেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন তিলক বর্মা(Asia Cup Final 2025)। অফ স্ট্যাম্পের বাইরে বল খেলে তিলককে রোখার চেষ্টা করলেও, পাক বোলারদের সেই প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেন তিলক। শিবম দুবেকে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ব্যাট করে দলকে ঈপ্সিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যান। পঞ্চম উইকেটে দু’জনে যোগ করেন ৬০ রান। আর তাতেই ভারতের জয়ের ভিত মজবুত হয়। রউফের ১৫তম ওভারে ১৭ রান তুলে ১০০ রান করে জেতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ভারত। শেষ ৩ ওভারে ভারতের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৩০ রান। ১৮ তম ওভারে আবারও বল করতে আসেন রউফ।
আবারও ১৩ রান করে জয়ের আরও কাছে পৌঁছে যায় ভারত(Asia Cup Final 2025)। কিন্তু ১৯তম ওভারের শেষ বলে শিবম দুবেকে ফিরিয়ে ম্যাচ জমিয়ে দেন ফাহিম। ২২ বলে দু’টি করে বাউন্ডারি ও ওভার বাউন্ডারির সাহায্যে ৩৩ রান করে আউট হন দুবে। শেষ ওভারে ভারতের জয়ের জন্য দরকার ছিল ১০ রান। রউফের প্রথম বলে দুই রান নিয়ে ব্যবধান কমান তিলক। পরের বলে ওভার বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ভারতের জয় নিশ্চিত করে দেন ম্যাচের তথা ফাইনালের নায়ক তিলক বর্মা। তিলকের ব্যাট থেকে ছিটকে বেরোনো বল গ্যালারিতে পড়তেই যেভাবে কোচ গৌতম গম্ভীর টেবিল চাপড়ে সেলিব্রেশন করলেন, তাতে বোঝাই গেল মাথা থেকে যেন হিমালয় সমান চাপ নামলো।
দু’বল বাকি থাকতেই এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন
এরপর দু’বল বাকি থাকতেই বাউন্ডারি মেরে ভারতের রেকর্ড নবমবার এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত করেন রিঙ্কু সিং(Asia Cup Final 2025)। ৫৩ বলে ৩ বাউন্ডারি ও চার ওভার বাউন্ডারির সাহায্যে অপরাজিত ৬৯ রানের অবিস্মরণীয় ইনিংস খেলে দলকে চ্যাম্পিয়ন করে মাঠ ছাড়লেন ম্যাচের সেরা তিলক। এক বলে চার রান করে অপরাজিতা থেকে গেলেন টুর্নামেন্টে প্রথমবার ব্যাট করতে নামা রিঙ্কু।
তাঁর হাত থেকে চ্যাম্পিয়নশিপ রানটা পাইয়ে দিয়ে ক্রিকেট ঈশ্বরও রিঙ্কুর প্রতি একটা পোয়েটিক জাস্টিস করলেন। কথাতেই আছে, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। শুরুতে পাকিস্তানের বোলাররা যে চাপটা তৈরি করেছিলেন, তা ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতার মাশুল গুনতে হল তাদের। টুর্নামেন্টে ভারতের কাছে হারের হ্যাটট্রিক করে মুখ পুড়িয়ে খালি হাতেই দেশে ফিরতে হচ্ছে।


