Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল:মানসিক অসুখ বলতে আমরা প্রায়শই একঘেয়ে বিষণ্নতা বা হালকা মুড পরিবর্তনকে বুঝি (Bipolar Disorder)। অথচ “মানসিক রোগ” নামের বিশাল ছাতার নীচে রয়েছে অসংখ্য জটিল অবস্থা। তার মধ্যে অন্যতম হল বাইপোলার ডিসঅর্ডার, যেটি শুধুমাত্র “মুড সুইং”-এর আরেকটি নাম নয়, বরং এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতা। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অস্বাভাবিক মাত্রায় উচ্ছ্বাস ও গভীর বিষণ্নতার মধ্যে বারবার দোলাচল দেখা যায়।

কীভাবে প্রভাব ফেলে! (Bipolar Disorder)
বিখ্যাত চিকিৎসা সংস্থা মায়ো ক্লিনিক জানাচ্ছে, এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর মেজাজ, চিন্তাধারা, দৈনন্দিন আচরণ ও কাজ করার ক্ষমতায় তীব্র ওঠানামা ঘটে। হঠাৎ করেই তিনি স্বাভাবিক ধারা থেকে সরে গিয়ে কখনও অতি-আত্মবিশ্বাসী, উদ্যমী ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন; আবার কয়েকদিনের মধ্যেই গভীর হতাশা, ক্লান্তি ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত হন। এই অনিয়মিত ওঠানামা শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, কর্মক্ষেত্র, সম্পর্ক ও সামাজিক পরিসরকেও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
রোগটির প্রধান দুটি ধাপ বা পর্যায় সাধারণত ম্যানিয়া এবং ডিপ্রেশন। রোগীভেদে এই ধাপগুলির সময়কাল ও তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে—কেউ হয়তো কয়েক সপ্তাহ ধরে ম্যানিয়ার মধ্যে থাকেন, আবার কারও ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের পর্যায় কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার লক্ষণ (Bipolar Disorder)
ম্যানিয়া হল এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে স্বাভাবিক আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা ও শক্তির সঞ্চার ঘটে। এর ফলে ব্যক্তি অবাস্তব আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে যান এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার প্রবণতা দেখা দেয়। সাধারণত নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো লক্ষ্য করা যায় –
- অস্বাভাবিকভাবে প্রফুল্ল, চঞ্চল ও উত্তেজিত থাকা
- অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা “আমি সব পারি” ভাব
- ঘুমের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
- প্রচুর কথা বলা বা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কথোপকথন করা
- একসঙ্গে বহু চিন্তা আসা, মন এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে দ্রুত সরে যাওয়া
- কোনও কাজে মনোনিবেশ করতে অসুবিধা
- নতুন নতুন কাজের পরিকল্পনা করা বা অযথা ব্যস্ত থাকা
- বেপরোয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ—অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, অস্থির ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তাহীন যৌনসম্পর্ক ইত্যাদি
ডিপ্রেশনের লক্ষণ (Bipolar Disorder)
ম্যানিয়ার উচ্ছ্বাস শেষ হলে বা কোনও কোনও সময় সরাসরি রোগী প্রবেশ করেন তীব্র বিষণ্নতায়। এই অবস্থায় মানুষ গভীর হতাশা ও শূন্যতায় ভুগতে থাকেন। প্রধান লক্ষণগুলো হল –
- দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ, হতাশা বা শূন্যতা অনুভব
- আগে যেসব কাজে আনন্দ পেতেন তাতে আগ্রহ হারানো
- নিরন্তর ক্লান্তি, শক্তিহীনতা
- ঘুমের সমস্যা—অতিরিক্ত ঘুমানো বা ঘুমোতে অসুবিধা
- ক্ষুধায় পরিবর্তন—ওজন হঠাৎ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
- মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া
- আত্মমর্যাদাহানি বা অকারণ অপরাধবোধ
- মৃত্যুচিন্তা বা আত্মহত্যার ভাবনা
কেন সচেতনতা জরুরি (Bipolar Disorder)
বাইপোলার ডিসঅর্ডার “চরিত্রের সমস্যা” বা “ইচ্ছে করলে ঠিক হয়ে যাবে” ধরনের অবস্থা নয়। এটি একটি জটিল স্নায়বিক-মানসিক অসুখ, যার পেছনে জেনেটিক প্রবণতা, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের গড়মিল, চাপ বা জীবনঘটিত আঘাতের মতো কারণ থাকতে পারে। উপযুক্ত চিকিৎসা ও মনোবিদ্যার সহায়তায় এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
- অস্বাভাবিক আনন্দ বা তীব্র হতাশার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- মনোবিদ বা সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
- পরিবার ও বন্ধুরা রোগীর পাশে থাকুন, কারণ সমর্থন ও বোঝাপড়া এই দীর্ঘমেয়াদি রোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আরও পড়ুন: Hokkaido: প্রেম বয়েস মানে না, প্রতারণার খেলায় মাতে?
মনে রাখবেন, শরীর সুস্থ রাখতে যেমন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি, তেমনই মন সুস্থ রাখার জন্যও সচেতনতা, যত্ন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা অপরিহার্য। মানসিক অসুখকে অবহেলা করলে জীবনমানের অবনতি ঘটে; অথচ সময়মতো পদক্ষেপ নিলে এর প্রভাব অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।



