Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: মানুষের শরীর প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি (Calf Muscle)। প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, লিভার কিংবা কিডনির মতো অঙ্গগুলিকে আমরা সহজেই গুরুত্ব দিই। কিন্তু শরীরের এমন অনেক অঙ্গ বা পেশি রয়েছে যেগুলি আমাদের নজরে আসে না অথচ জীবনরক্ষার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। তেমনই একটি অঙ্গ হল কাফ মাসল (Calf Muscle)। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘দ্বিতীয় হৃদযন্ত্র’ ।
প্রথমে শুনে হয়তো অবাক লাগতে পারে—হৃদপিণ্ড যেখানে রক্ত পাম্প করে গোটা শরীর সচল রাখে, সেখানে আবার পায়ের একটা পেশি কীভাবে ‘দ্বিতীয় হৃদযন্ত্র’ হতে পারে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে রক্ত সঞ্চালনের অদ্ভুত বিজ্ঞান ও শরীরতত্ত্বে।
কাফ মাসল আসলে কী? (Calf Muscle)
পায়ের কাফ মাসল বলতে মূলত দু’টি বড়ো পেশিকে বোঝানো হয়—
- গ্যাস্ট্রোকনিমিয়াস
- সোলিয়াস
এই দুই পেশি মিলে পায়ের পেছনের অংশে হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। যখন আমরা হাঁটি, দৌড়াই, সিঁড়ি ভাঙি বা দেহের ভার সামলাই, তখন এই পেশিগুলিই সবচেয়ে বেশি কাজ করে।
গ্যাস্ট্রোকনিমিয়াস মূলত দ্রুত নড়াচড়া বা জোরালো কাজের সময় সক্রিয় হয়, আর সোলিয়াস দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বা ধীরে হাঁটার সময় সক্রিয় থাকে।
কেন বলা হয় ‘দ্বিতীয় হৃদযন্ত্র’? (Calf Muscle)
আমাদের আসল হৃদযন্ত্র উপরের দিকে বক্ষগহ্বরে থাকে। এটি ক্রমাগত রক্ত পাম্প করে শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন রক্তকে শরীরের নিচের অংশ থেকে—বিশেষত পা থেকে—উপরে আবার হৃদযন্ত্রে ফেরত পাঠাতে হয়।
চ্যালেঞ্জ: মাধ্যাকর্ষণের কারণে নিচের দিক থেকে রক্ত ওপরে উঠতে চায় না। ফলে রক্ত অনেক সময় নিচে জমে যায়।
সমাধান: তখন কাফ মাসল কাজে লাগে। যখন এই মাসল সংকুচিত হয় (যেমন হাঁটার সময় বা দাঁড়ানো থেকে ওঠার সময়), তখন এটি একধরনের ‘পাম্প’-এর মতো কাজ করে। পায়ের শিরার ভেতরে চাপ সৃষ্টি করে এবং জমে থাকা রক্তকে ওপরে, অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়।
চলাফেরা কম হলেই বাড়ে বিপদ (Calf Muscle)
আজকের আধুনিক জীবনে অনেকের কাজ অফিস বা বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকার সাথে যুক্ত। এভাবে দীর্ঘক্ষণ কাফ মাসলের স্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণ বন্ধ থাকে। এর ফলে—
- রক্ত নিচে জমে যেতে শুরু করে
- পায়ের শিরায় অস্বাভাবিক চাপ পড়ে
- ধীরে ধীরে শিরা ফুলে ওঠে
- পা ভারী লাগা, ব্যথা ও ফোলাভাব দেখা দেয়
- দীর্ঘদিন অবহেলা করলে (DVT) নামক গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ে, যেখানে রক্ত জমাট বেঁধে জীবনহানিও ঘটতে পারে
কারা বেশি ঝুঁকিতে? (Calf Muscle)
- অফিসে ডেস্ক জব করা কর্মীরা
- যাঁরা দীর্ঘ সময় বিমানে বা ট্রেনে বসে ভ্রমণ করেন
- সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করেন (যেমন শিক্ষক, সার্ভিস কর্মী)
- স্থূলতা বা ওবেসিটিতে ভোগা মানুষ
- যাঁরা খুব কম হাঁটাহাঁটি বা শরীরচর্চা করেন
কীভাবে সতেজ রাখবেন?
নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন
দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা কাফ মাসলকে সক্রিয় রাখে। হাঁটা না হলে দিনে কয়েকবার দাঁড়িয়ে ২-৩ মিনিট হাঁটুন।
স্ট্রেচিং ও ব্যায়াম
- Calf Raises: দাঁড়িয়ে পায়ের পাতার উপর ভর করে উঠুন ও নামুন।
- Ankle Pump Exercise: বসে বা শুয়ে পায়ের গোড়ালি উপরে-নিচে নড়ান।
- Stretching: দেওয়ালে হাত রেখে এক পা পিছনে নিয়ে হালকা টানুন।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকবেন না
প্রতি ৩০-৪০ মিনিট অন্তর চেয়ার থেকে উঠে কিছুটা হাঁটুন।
জল পান বাড়ান
পর্যাপ্ত জল পান করলে রক্তের ঘনত্ব স্বাভাবিক থাকে, রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা কমে যায়।
কম্প্রেশন মোজা ব্যবহার
যাঁদের শিরার সমস্যা রয়েছে বা দীর্ঘ ভ্রমণে বেরোতে হয়, তাঁদের জন্য কম্প্রেশন স্টকিংস খুব কার্যকরী।
ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন
অতিরিক্ত ওজন কাফ মাসলের ওপর চাপ বাড়ায় এবং কাজ ব্যাহত করে।
হৃদপিণ্ড যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নীরবে সমান গুরুত্বপূর্ণ পায়ের কাফ মাসলও। আমরা হাঁটছি, দাঁড়িয়ে আছি বা দৌড়চ্ছি—এই নীরব ‘দ্বিতীয় হৃদযন্ত্র’ প্রতিনিয়ত আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে, রক্ত ফিরিয়ে আনছে হৃদপিণ্ডে।
আরও পড়ুন: Purba Bardhaman: দেবশালার অমর প্রেমকাহিনির অলিখিত সমাধি
অতএব, একে অবহেলা না করে প্রতিদিন অল্প সময় ব্যায়াম ও সচলতার মাধ্যমে সক্রিয় রাখুন। কারণ হৃদপিণ্ড সুস্থ থাকলেও যদি পায়ের এই রক্ত পাম্প দুর্বল হয়ে যায়, তবে গোটা শরীরের সঞ্চালন ব্যবস্থাই ব্যাহত হবে।



